পার্কভিউতে এক প্রসূতির দুই দফা অস্ত্রোপচার: ৪টার পর মেয়েকে আর দেখতে পাননি মা!

রাতভর হট্টগোল, স্বজনদের প্রশ্নের মুখে চিকিৎসাব্যবস্থা

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:২২

চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে সন্তান প্রসবের পর এক প্রসূতিকে ফের অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়াকে কেন্দ্র করে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তাঁর স্বজনেরা।

তাঁদের দাবি, প্রসূতির নাম সাজু। স্বামীর নাম মো. ইমরান। তার তীব্র যন্ত্রণা কমিয়ে সুস্থভাবে সন্তান প্রসবের আশায় স্ত্রীরোগ, প্রসূতি বিদ্যা বিশেষজ্ঞ ও সার্জন অধ্যাপক ডা. জাহানারা বেগম শিখার তত্বাবধানে তাকে পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে চিকিৎসকরা প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার (সিজার) সম্পন্ন করেন এবং একটি নবজাতক জন্ম নেয়। তবে বিপত্তি ঘটে এর কিছুক্ষণ পর।

অভিযোগ ওঠে, প্রথম অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকদের মারাত্মক কোনো ভুল বা অদক্ষতার কারণে প্রসূতির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ৭/৮ ব্যাগেরও বেশি রক্ত দেওয়া হলেও রক্তের ক্ষরণ বা শারীরিক জটিলতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছিল না।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে অভ্যন্তরীণ একটি জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক দল গঠন করে।

স্বজনদের দাবি, চট্টগ্রামের বিশিষ্ট চিকিৎসক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) গাইনি ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক প্রফেসর ডা. সাহেনা আক্তারসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হাসপাতালে এসে পৌঁছান এবং রোগীকে দেখে যান।

রাত ৯টার দিকে প্রসূতিকে পুনরায় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নেওয়া হয়। পুনরায় স্বজনদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে প্রসূতির পেটে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার পরিচালনা করে হাসপাতালের ওটি টিম।

ঘটনার পর রাতভর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের তর্ক-বিতর্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

এ সময়কার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি আরও আলোচনায় আসে। তবে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার কেন করতে হয়েছিল, রোগীর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা কী এবং চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তের চিকিৎসাগত কারণ কী-এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।

‘বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে নিয়ে গেছে’-কিন্তু রোগী কোথায়?

প্রসূতির মা মরতুজা বেগম অভিযোগ করে বলেন, প্রথমবার সিজারের পর তাঁর মেয়েকে ফের অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হলেও বিষয়টি তাঁদের পরিষ্কার করে জানানো হয়নি। বরং তাঁরা রোগীকে দেখতে চাইলে হাসপাতালের পক্ষ থেকে বলা হয়, শিশুকে দুধ খাওয়ানোর জন্য রোগীকে নেওয়া হয়েছে।

রোগীর মায়ের ভাষ্য, ৪টার পর থেকে আমার মেয়ে কেমন আছে আর জানতে পারিনি। তার সঙ্গে দেখা করতে দেয়নি। শুধু বলছে, বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে নিয়ে গেছে। অথচ বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো হচ্ছে না। বাচ্চাকে তোলানি খাওয়ানো হচ্ছে।

স্বজনদের প্রশ্ন, রোগীর অবস্থা যদি স্বাভাবিকই থাকে, তাহলে তাঁকে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়ার প্রয়োজন হলো কেন? আর যদি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে রোগীর স্বজনদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি কেন?

৮ ব্যাগের বেশি রক্ত দেওয়ার দাবি

রোগীর মা বলেন, প্রথম সিজারের পর চিকিৎসকের কোনো ভুলের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, তাকে যখন প্রথমে সিজার করা হয়, তখন চিকিৎসক নিশ্চয় কিছু ভুল করেছে। ৮ ব্যাগের উপরে ব্লাড দেওয়া হয়েছে। কোনো কাজ হচ্ছে না।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। তাঁদের মধ্যে ডা. শাহনাসহ কয়েকজন চিকিৎসক হাসপাতালে আসেন। এরপর রোগীকে পুনরায় অস্ত্রোপচার করা হয় এবং পরে আইসিইউতে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।

আজ বুধবার (বিকেল সাড়ে ৪টা) এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রসূতি সাজুর ভাই মো. ওমর ফারুক জানান, হাসপাতাল থেকে কোন সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। কিছুক্ষণ বলছে রোগী ভাল আছে। আবার কিছুক্ষণ পরে বলছে সংকটাপন্ন। রক্ত প্রয়োজন। প্রেসার কমে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় স্বজনরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উল্লেখ করে রোগীর ভাই দাবি করেন, কেন এরকম হল?

সবশেষ পৌণে ৫টার সময় আইসিইউ চিকিৎসক ডা. আশিষ স্বজনদের জানান, রোগীর অবস্থা ভাল না। লাইফ সাপোর্ট লাগতে পারে। এটা শুনেই স্বজনরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তার ভাই ওমর ফারুক বলেন, ওরা আমার বোনকে শেষ করে দিয়েছে।

তিনি ঘটনার সুষ্ট তদন্ত করে রোগীর সত্যিকার অবস্থা পরিস্কার করা এবং তার যথাযত চিকিৎসা নিশ্চিতের মাধ্যমে বোনকে জীবিত ফেরত চান।

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, একই হাসপাতালে গতকাল তাদের মতোই আরও একটি রোগীর একই অবস্থা হয়েছে। তার অবস্থাও সংকটাপন্ন। তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রশ্ন করেন, রোগীর যদি কিছু হয়ে যায় দায়ভার কে নিবে?

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

ঘটনাটি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ ফোন ধরেননি।

ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো অনুত্তরিত-প্রথম অস্ত্রোপচারের পর রোগীর কী জটিলতা দেখা দিয়েছিল? দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারের চিকিৎসাগত প্রয়োজন কী ছিল? অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে স্বজনদের কী জানানো হয়েছিল? এবং রোগীর বর্তমান শারীরিক অবস্থা কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় ঘটনার স্বচ্ছতা নিয়ে স্বজনদের সন্দেহ আরও বেড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

রাতভর উত্তেজনা, ছড়িয়ে পড়ল ভিডিও

দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রাতভর রোগীর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তর্ক-বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয় বলে জানা গেছে।

এর মধ্যেই মঙ্গলবার রাত ১১টা ২৮ মিনিটে ‘Psp Vision’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা হয়-চট্টগ্রামে পার্কভিউ হাসপাতালের বিরুদ্ধে এক রোগীকে ‘দুইবার সিজারে’র অভিযোগ, স্বজনদের হট্টগোল!

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য শুরু হয়। অনেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা মন্তব্যকে ঘটনার সত্যতা প্রমাণের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

সামাজিক মাধ্যমে নানা দাবি, প্রশ্নও অনেক

ভিডিওটির কমেন্টে Md Lokman RL নামের একটি আইডি থেকে দাবি করা হয়, অপারেশনের সময় রোগীর পেটের ভেতরে কোনো সরঞ্জাম রেখে আসার কারণেই দ্বিতীয়বার অপারেশন করতে হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো চিকিৎসা নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে Airen Sultana Rani নামের একটি আইডি Jannat Ul Ferdous-কে উদ্ধৃত করে মন্তব্য করেন, bandubi tor obosta..tor o 2 bar korce na? এর জবাবে Runabegum Runa নামের আইডি থেকে বলা হয়, সিজারের পর পেটের ভেতরে রক্তক্ষরণ বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা পরীক্ষা বা চিকিৎসার জন্য আবার পেট খোলা হতে পারে এবং জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে এমনটি করা হতে পারে।

এই মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিৎসাগত সম্ভাবনার কথা সামনে আনে। তবে এই নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা কেবল সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি, অস্ত্রোপচারের বিবরণ এবং চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা থেকেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

আরেক পরিবারের মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে

ঘটনার ভিডিওর মন্তব্যে Salina Jahan Bobbi নামে একজন তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে পার্কভিউ হাসপাতালের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তিনি লেখেন, আজকের দিনে ৫ আগস্ট আমার আব্বু হেঁটে parkview তে গেছিলো। আমার আব্বুকে আনতে হলো Ambulance করে। আজ আব্বুকে হারায় ফেলছি।

তবে এই মন্তব্যের সঙ্গে বর্তমান প্রসূতির চিকিৎসা-ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। ওই ব্যক্তির অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া Nirob Mohin Uddin, Lutful Haider, Anjuman Chowdhury, নিশ্চুপ নিস্তব্ধতা এবং Mohammad Alamgir নামের আইডি থেকে পার্কভিউ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে কঠোর ও নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে। কেউ হাসপাতালকে “কসাইখানা”, কেউ “ডাকাতের হাসপাতাল” বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে এসব মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত বক্তব্য।

তদন্ত ছাড়া কি মিলবে উত্তর?

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারটি আদৌ হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কেন হয়েছিল এবং চিকিৎসাগতভাবে সেটি কতটা জরুরি ছিল-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

রোগীর স্বজনেরা অভিযোগ করছেন, দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারের বিষয়টি তাঁদের কাছ থেকে গোপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো রোগীর অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা দেখা দিলে জীবন রক্ষার জন্য পুনরায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে স্বজনদের অভিযোগটি নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও প্রয়োজন স্পষ্ট ব্যাখ্যা-কী হয়েছিল সেই বিকেল ৪টার পর? কেন একজন প্রসূতিকে আবার অস্ত্রোপচার কক্ষে নিতে হলো? আর কেন তাঁর মা মেয়েকে দেখতে না পেয়ে শুধু আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে থাকতে বাধ্য হলেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগী ও স্বজনের তথ্য জানার অধিকার, চিকিৎসায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।