বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে পণ্য কেনাকাটার নতুন পদ্ধতি ‘রিভার্স প্রকিউরমেন্ট অর্ডার’ (আরপিও) ঘিরে বড় ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ সংকুচিত করে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে শত কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মো. আনোয়ারুল ইসলামের বিতর্কিত ভূমিকা।
একই সঙ্গে সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নতুন পরিচয় ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
ক্ষমতার পালাবদলে খোলস বদল ও দুর্নীতির সাম্রাজ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক এক রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয়ের সুবাদে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দুর্নীতি ও লুটপাটে লিপ্ত ছিলেন এই কর্মকর্তা। ভাই, স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে একাধিক ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, ফ্ল্যাট এবং গ্রামের বাড়িতে শত কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি।
তার অনিয়ম-দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের একাধিক কর্মচারী বিভিন্ন সময় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করলেও, অবৈধ অর্থের বিনিময়ে দুদক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে পদোন্নতি নিয়ে দিব্যি বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি এখন নিজেকে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মহলের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে পুরো রেল বিভাগকে জিম্মি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের আওতায় আরপিও পদ্ধতিতে বিপুল অঙ্কের সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কেনাকাটা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চালানো হয়, যার বড় একটি অংশ মাত্র তিন-চারটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
প্রচলিত সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (এলটিএম) বা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম)-এর মতো প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ বাদ দিয়ে এমন এককভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা সরাসরি কমিশন লেনদেনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আনোয়ারুল ইসলাম যোগদানের পরই আরপিও চালুর প্রস্তাব রেল ভবনে পাঠানো হয়। প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল উদ্দিন সরকার এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) ফকির মো. মহিউদ্দিনের স্বাক্ষরের পর মহাপরিচালকের অনুমোদন নিয়ে এই বিতর্কিত কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) ফকির মো. মহিউদ্দিন পদ্ধতিটি স্থগিত করা এবং আগের নিয়মেই কেনাকাটা পরিচালনার ঘোষণা দেন।
তবে প্রশ্ন উঠেছে-স্থগিতের পূর্বের সময়ে সম্পাদিত ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রকৃত আর্থিক পরিমাণ কত, কোন প্রক্রিয়ায় কাজগুলো বণ্টন করা হয়েছে এবং এর সুফল কারা ভোগ করেছে। সূত্র ভোরবেলা
দপ্তরটির পুরোনো মামলার ছায়া এবং আত্মসাতের ইতিহাস
পাহাড়তলীর বর্তমান কেনাকাটার এই অস্বচ্ছতার সঙ্গে কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল ইসলামের পুরোনো দুর্নীতি মামলার যোগসূত্র রয়েছে। গত ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে মালামাল সরবরাহ না করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. আহসানুল কবীর পলাশ।
মামলা নম্বর ২৬: এই মামলায় রেলওয়ের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলামসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আসামি করা হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার, নথিপত্র পরিবর্তন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এই মামলায়।
অন্যান্য মামলা: এর আগে ফরিক আহমেদ ও মুহাম্মদ রাশেদুল আমিনের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা দায়ের করেছিল দুদক। এসব মামলার এজাহারে ভুয়া মালামাল ক্রয়ের রেকর্ডপত্র সৃষ্টি ও প্রতারণার তথ্য উঠে আসে।
পাহাড়তলী সরঞ্জাম দপ্তরের ক্রয়প্রক্রিয়ায় চাহিদাপত্র তৈরি, বাজারদর যাচাই, পণ্য গ্রহণ, স্টক রেজিস্টারে এন্ট্রি এবং বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বড় চাহিদাপত্রগুলোকে ছোট ছোট ফাইলে বিভক্ত করে অনুমোদনের কাঠামো অপব্যবহার করার যে কৌশল আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেছে, তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল আরপিও পদ্ধতি স্থগিত করলেই চলবে না বরং পূর্বে সম্পন্ন হওয়া সব কার্যাদেশের নথি, অনুমোদন ফাইল, মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং বিল পরিশোধের তথ্য নিরপেক্ষভাবে অডিট করা জরুরি। তা না হলে রেলওয়ের কেনাকাটায় দুর্নীতির এই চক্র থামানো সম্ভব হবে না।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) দপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে দপ্তরটির অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ারুল ইসলাম অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
আরপিও (রিভার্স প্রকিউরমেন্ট অর্ডার) পদ্ধতি চালু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ‘রিভার্স প্রকিউরমেন্ট অর্ডার’ বা ‘আরপিও’ নামে কোনো পদ্ধতি অতীতেও প্রচলিত ছিল না, বর্তমানেও নেই। যেহেতু এ জাতীয় কোনো পদ্ধতির অস্তিত্বই নেই, তাই এটি চালু বা অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা থাকার প্রশ্নটি সম্পূর্ণ অবান্তর।
কাজ বণ্টনে স্বজনপ্রীতি ও সীমিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদানের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আরপিও পদ্ধতির কোনো ভিত্তি না থাকায় এর আওতায় নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। যদি কেউ সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ বা কার্যাদেশপ্রাপ্ত সরবরাহকারীর তথ্য প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে পারেন, তবে তা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দেখা হবে।
আনোয়ারুল ইসলাম আরপিও পদ্ধতি চালু বা অস্তিত্বের বিষয়টি ‘সম্পূর্ণ বানোয়াট ও অবান্তর’ বলে দাবি করলেও, তার নিজের স্বাক্ষরিত আদেশের সূত্রে ‘আরপিও নং ২৪৭/এ’-এর অনুচ্ছেদ-২ উল্লেখ থাকা নিয়ে প্রশাসনিক ও ঠিকাদারি মহলে নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। নথি ও বক্তব্যের এই স্পষ্ট বৈপরীত্যের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
দুদকের এজাহারভুক্ত অভিযোগে ১ নম্বর আসামি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেটা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এর সাথেই যোগাযোগ করা সমীচীন।
সবশেষে নিকটাত্মীয়দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা প্রশাসনিক পদায়নে প্রভাব বিস্তারের যে দাবি উঠেছে, তা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এ কর্মকর্তা।
