চন্দনাইশ পৌরসভায় রাজীব রাজত্ব-ইমারত নির্মাণ থেকে জনস্বাস্থ্য-সর্বত্রই দুর্নীতির থাবা

ঘুষ বাণিজ্য,অর্থ আত্মসাতের মহোৎসবে স্থবির উন্নয়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৪১

চন্দনাইশ পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য এবং চরম অব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

২০১৭ সালে বান্দরবান পৌরসভায় নকশাকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে চন্দনাইশ পৌরসভায় বদলি হয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে উপ-সহকারী প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ এবং ২০২২ সালে পদোন্নতির পর থেকে তার একক স্বেচ্ছাচারিতায় পৌরসভার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নকাজ আজ প্রায় স্থবির।

গত ২৮ জানুয়ারি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদানের পাশাপাশি তার সময় বাস্তবায়নকৃত সকল প্রকল্পের ফাইল তলব করা হলেও নানা উপায়ে তা ধামচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও এলডিপি পৌরসভা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকতার উদ্দীনের দায়ের করা অভিযোগ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

ইমারত নির্মাণ অনুমোদন কমিটিতে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য

পৌরসভায় সুনির্দিষ্ট ইমারত নির্মাণ অনুমোদন কমিটি থাকা সত্ত্বেও সেই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সরাসরি ফাইল অনুমোদনের কথা বলে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করা হচ্ছে।

আবদুল শুক্কুরের কাছ থেকে ৩৮ হাজার টাকা, হামিদুল্লাহ সিকদারের কাছ থেকে ৪৫ হাজার টাকা এবং শাহা আলমের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকাসহ অসংখ্য ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরও ভবন নির্মাণের অনুমোদন না দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে।

বিগত তিন বছর ধরে নিয়মের তোয়াক্কা না করে ঘুষের বিনিময়ে একের পর এক অনুমোদনহীন ইমারত নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাংলাদেশ পৌরসভা পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় পানি সরবরাহ লাইনের কাজে ঠিকাদারের সঙ্গে অবৈধ যোগসাজশে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে। নকশা অনুযায়ী পাইপ এক মিটার গভীরে বসানোর কথা থাকলেও মাত্র আধা মিটার গভীরে বসিয়ে মাটি ভরাট করা হয়েছে।

এমনকি অনেক স্থানে কোনো পাইপই না বসিয়ে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, প্রায় ৮০০টি পিট ল্যাট্রিন স্থাপনের ক্ষেত্রে পৌরসভার অনুমোদন ছাড়াই নিজের ইচ্ছামতো তালিকা তৈরি করে আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে এবং অনেক উপকারভোগীর টয়লেট নির্মাণ না করেই বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।

অডিটে প্রমাণিত ২১ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি

২০২১-২০২২ থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত চন্দনাইশ পৌরসভার অডিটে ধরা পড়ে যে, গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়)-এর আওতায় বিসি রাস্তার ব্রিক ওয়াল নির্মাণে রাস্তার প্রস্থের আয়তন বাদ না দিয়ে অতিরিক্ত বিল প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়া আর্থ ফিলিংয়ের ক্ষেত্রে বক্স কাটিংয়ের মাটি কর্তন না করেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সরকারের মোট ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৬১০ টাকা আর্থিক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।

সচিবের দায়িত্বে অনিয়ম ও ১০ কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেওয়া

পৌরসভার সচিবের শূন্যপদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজীব মজুমদার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দেন। দুলারপাড়া বা দুর্লভপাড়া এলাকায় ভবনমালিকদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে পরিকল্পনাহীনভাবে নালা, রিটেইনিং ওয়াল ও রাস্তা সংস্কারের প্রায় ১০ কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেওয়া হয়। ঠিকাদারের পর্যাপ্ত পুঁজির অভাব এবং তদারকির অভাবে এই উন্নয়নকাজগুলো বর্তমানে অত্যন্ত ধীরগতির শিকার হয়েছে।

এছাড়া প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়া সত্ত্বেও পৌরবাসী নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হলেও তিনি তা বিভিন্ন উপায়ে ম্যানেজ করে ধামাচাপা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চরম জনদুর্ভোগে গাছবাড়ীয়া-আব্দুল বারী হাট সড়ক

ঠিকাদারের ধীরগতি ও সংশ্লিষ্টদের চরম অবহেলার কারণে চন্দনাইশ পৌরসভার গাছবাড়ীয়া খাঁনহাট থেকে আব্দুল বারী হাট পর্যন্ত সড়কের সংস্কারকাজ-বিশেষ করে দুর্লভপাড়া বটতল এলাকার পুকুরপাড়ের কাজ দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘নিপা এন্টারপ্রাইজ’ কাজ মাঝপথে ফেলে রাখায় পুকুরপাড় ভেঙে চলাচলের পুরোপুরি অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

বাঁশের নড়বড়ে সাঁকো এবং কোনো ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন।

সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের প্রায় সাতটি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভার একাংশের মানুষের সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বেহাল দশায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

পরিদর্শনে উৎকোচ ও কমিশন বাণিজ্য

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাব-ঠিকাদার মো. তসলিম উদ্দীনের ভাষ্যমতে, রাজীব মজুমদার প্রতিটি কাজের জন্য ৩০ শতাংশ কমিশন দাবি করেন। চন্দনাইশ হাসপাতালের গেট থেকে তিনি ৯০ হাজার টাকা ঘুষ আদায় করেছেন।

কোনো সাইটে একবার পরিদর্শনে গেলেই ঠিকাদারকে পরিদর্শন ফি বাবদ নগদ প্রায় ৪ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়, অন্যথায় তিনি বিল আটকে দেন।

সমস্ত শর্ত ও দাবি পূরণ করার পরও চূড়ান্ত বিল ছাড়করণের সময় অতিরিক্ত ৬ শতাংশ ঘুষের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।

প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ ও পদক্ষেপ

স্থানীয় বাসিন্দা ও এলডিপি পৌরসভা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকতার উদ্দীনের দায়ের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক মোছাম্মৎ রাশেদা আক্তারের স্বাক্ষরিত স্মারকে রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

পর্যায়ক্রমে তার সময় বাস্তবায়নকৃত সকল প্রকল্পের ফাইল নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের স্থানীয় সরকার দপ্তরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা নিয়ে নানা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাজীব মজুমদারের সাথে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে এই দুর্নীতির নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্তপূর্বক উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।