সামান্য অসতর্কতায় ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা, ঝরে যেতে পারে মূল্যবান প্রাণ। তাই সড়কে চলাচলের সময় সচেতনতা, সতর্কতা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন।
তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সোমবার (২ নভেম্বর) নগরের আইয়ুব বিবি সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আয়োজনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও শিক্ষার্থী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা শুধু সরকারের বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের নিরাপত্তার প্রতিও প্রত্যেক নাগরিককে দায়িত্বশীল হতে হবে। সামান্য সচেতনতা ও সতর্কতা অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
অনুষ্ঠানস্থলের পাশেই ব্যস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে মইজ্জ্যারটেক এলাকায় প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।
তাই শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের সময় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ডান-বাম ভালোভাবে দেখে এবং যানবাহনের গতিবিধি বুঝে নিরাপদ স্থানে রাস্তা পার হতে হবে।
সড়ক ব্যবস্থাপনায় নাগরিক দায়িত্বের প্রসঙ্গ তুলে চসিক প্রশাসক বলেন, ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য। কেউ ফুটপাত দখল করে মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। রাস্তায় কোনো প্রতিবন্ধকতা কিংবা ক্ষতিকর বস্তু পড়ে থাকতে দেখলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
শিক্ষার্থীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করেছিল। সেই সাহস ও দায়িত্ববোধ সমাজের অন্যান্য অন্যায়ের বিরুদ্ধেও কাজে লাগাতে হবে।
কোথাও ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি কিংবা সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড দেখলে দায়িত্বশীল ও আইনসম্মতভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে হবে।
নগরের পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধেও নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে ক্লিন, গ্রিন, সেফ ও স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সিটি করপোরেশন। এ লক্ষ্য অর্জনে নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন।
রাস্তায় পড়ে থাকা ডাবের খোসায় বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার প্রজনন হতে পারে। আবার কলার খোসায় পিছলে পথচারী দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। তাই যত্রতত্র ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে মোবাইল ফোনের অসতর্ক ব্যবহারকে চিহ্নিত করেন চসিক প্রশাসক। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলে কিংবা ভিডিও দেখে। কেউ কেউ দলবেঁধে গল্প করতে করতে রাস্তা পার হয়।
এতে আশপাশের যানবাহনের প্রতি মনোযোগ থাকে না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সড়কে চলাচলের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। চালকদেরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হবে।
এদিকে নগরের সড়ক নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নে কয়েকটি পরিকল্পনার কথা জানান ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটওভারব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং প্রয়োজন।
নগরের প্রায় ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আগামী এক মাসের মধ্যে দুটি স্থানে এ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সঙ্গে সমন্বয় করে চসিক এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
তিনি আরও জানান, নগরে ৩৮টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২১টির নির্মাণকাজ চলমান এবং অন্যগুলোর কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি জেব্রা ক্রসিং স্থাপন এবং রেলক্রসিং এলাকায় যানজট ও দুর্ঘটনা কমাতে ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ অর্জনের আহ্বান জানান চসিক প্রশাসক। তিনি বলেন, বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান আজিম আলী। উপস্থিত ছিলেন চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিদুয়ানুল ইসলাম, কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর মোহাম্মদ, আইয়ুব বিবি সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাহফুজুল রহমান এবং নিরাপদ সড়ক চাই চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সাজীব।
অনুষ্ঠানে রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। বক্তারা নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, চালক ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
