এক রাত, চার মৃত্যু: মুম্বাইয়ে দোখাডিয়া পরিবারের ট্র্যাজেডিতে নতুন প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০২ মে, ২০২৬ ১৭:২১

ভারতের মুম্বাইয়ে একই পরিবারের চার সদস্যের আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য।

শুরুতে ‘বিষাক্ত তরমুজ’ খেয়ে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লেও ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রাথমিক ফল সামনে আসার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে।

মৃতরা হলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ দোখাডিয়া (৪৫), তাঁর স্ত্রী নাসরিন (৩৫) এবং তাঁদের দুই কিশোরী কন্যা—জয়নাব (১৩) ও আয়েশা (১৬)। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে শোকের পাশাপাশি তৈরি করেছে নানা প্রশ্ন।

যা ঘটেছিল সেই রাতে
শনিবার রাতে আবদুল্লাহ দোখাডিয়া তাঁর পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে নৈশভোজের আয়োজন করেন। খাবারের তালিকায় ছিল মাটন পোলাও। পারিবারিক এই আয়োজন শেষে অতিথিরা চলে যান।

পরিবারের সদস্যরা রাত প্রায় ১টার দিকে তরমুজ খান। এরপর ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ করে সবাই বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন।

দ্রুত তাঁদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে মারা যান আবদুল্লাহ, নাসরিন, জয়নাব ও আয়েশা।

ফরেনসিক রিপোর্টে অস্বাভাবিক তথ্য
প্রাথমিক ফরেনসিক পরীক্ষায় চিকিৎসকেরা এমন কিছু লক্ষণ পেয়েছেন, যা সাধারণ খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনায় সচরাচর দেখা যায় না।

মৃতদের মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র ও অন্ত্রসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে সবুজাভ হয়ে গেছে।

এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন তদন্তকারীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ঠিক কী কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো এমন রূপ নিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তদন্তে নতুন মোড়: আবদুল্লাহর শরীরে মরফিন
তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, আবদুল্লাহ দোখাডিয়ার শরীরে মরফিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মরফিন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ, যা সাধারণত কঠোর চিকিৎসা তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করা হয়।

কীভাবে এই ওষুধ তাঁর শরীরে প্রবেশ করল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এটি কি কোনো চিকিৎসাজনিত কারণে ব্যবহার করা হয়েছিল, নাকি দুর্ঘটনাবশত শরীরে প্রবেশ করেছে? অথবা এর পেছনে অন্য কোনো পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল?—এসব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

তরমুজ কি সত্যিই দায়ী?
ঘটনার পরপরই ‘বিষাক্ত তরমুজ’ খেয়ে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাজ্যের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তরমুজের সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

তদন্তকারীরা আরও উল্লেখ করেছেন, ওই রাতে পরিবার ও অতিথিরা মাটন পোলাও খেয়েছিলেন। কিন্তু অতিথিদের কেউ অসুস্থ হননি। ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার সাধারণ ব্যাখ্যা এই ঘটনায় পুরোপুরি খাটছে না।

অপেক্ষা ভিসেরা রিপোর্টের
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চারজনের লাশের ভিসেরা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। এই রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত পুলিশ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছে না।

সব দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ
পুলিশ জানিয়েছে, পারিবারিক বিরোধ, ব্যবসায়িক শত্রুতা কিংবা অন্য কোনো বিষাক্ত পদার্থের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মুম্বাইয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনা এখন শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি পরিণত হয়েছে এক জটিল রহস্যে।

ভিসেরা রিপোর্ট প্রকাশের পরই হয়তো জানা যাবে, এই চার মৃত্যুর পেছনে ছিল দুর্ঘটনা, বিষক্রিয়া, নাকি আরও ভয়াবহ কোনো ষড়যন্ত্র।