বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এক গৃহবধূর ভুল রোগ নির্ণয় (Misdiagnosis) এবং তড়িঘড়ি করে অস্ত্রোপচার করার এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসকেরা আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ‘জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ’ (Ectopic Pregnancy) এবং তা ফেটে যাওয়ার দাবি করে জরুরি অস্ত্রোপচার করলেও, পরবর্তীতে জানা যায় ওই নারী গর্ভবতীই ছিলেন না। মূলত অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথায় ভুগছিলেন তিনি।
এই ঘটনায় চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ ওঠার পর জেলা সিভিল সার্জন কর্তৃক একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে ভুক্তভোগী জান্নাত সুলতানা নগরের পাহাড়তলী এলাকার ‘আল আমিন হাসপাতালে’ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও চিকিৎসকের দাবি
ভুক্তভোগী জান্নাত সুলতানার স্বামী মো. রাকিবের বক্তব্য অনুযায়ী, চার মাস আগে তাঁদের বিয়ে হয়। গত সোমবার রাতে জান্নাতের তীব্র পেটব্যথা শুরু হলে মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যায় তাঁকে পাহাড়তলীর একে খান এলাকার আল আমিন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁরা গাইনি ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাহিদ সুলতানার শরণাপন্ন হন।
রোগীর উপসর্গ দেখে চিকিৎসক দ্রুত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেন। সনোলজিস্ট ডা. রাইসা ফাতেমার স্বাক্ষরিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়— রোগীর ডান পাশে ‘একটোপিক প্রেগন্যান্সি’ বা জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ডা. নাহিদ সুলতানা তাঁর প্রেসক্রিপশনে লেখেন, রোগীর ‘রাপচার্ড একটোপিক প্রেগন্যান্সি’ হয়েছে, অর্থাৎ জরায়ুর বাইরে ফ্যালোপিয়ান টিউবে থাকা ভ্রূণটি ফেটে গেছে। এটি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা এবং জীবন রক্ষার্থে দ্রুত পেট কেটে ‘ল্যাপারোটমি’ (Emergency Laparotomy) অপারেশন করা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীর স্বামীর বক্তব্য:
“ডাক্তার আমাদের জানান, বাচ্চা এসে জরায়ুর টিউব ফেটে গেছে। যা করার দ্রুত করতে হবে, নয়তো বড় ঝুঁকি হবে। আমরা ভয়ে ল্যাপারোটমি অপারেশনের সম্মতি দিই এবং রক্তের ব্যবস্থা করি।”
পরস্পরবিরোধী ল্যাব রিপোর্ট ও মূল বিতর্ক
এই ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকটি উন্মোচিত হয় হাসপাতালের ল্যাব রিপোর্টগুলো পর্যালোচনার পর। একই দিনে একই হাসপাতালে রোগীর দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রিপোর্ট আসে:
| পরীক্ষার নাম | পরীক্ষার ফলাফল | ইঙ্গিত/তাৎপর্য |
| আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG) | একটোপিক প্রেগন্যান্সি (সন্দেহজনক) | জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ ও টিউব ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা। |
| সেরোলজি (রক্তের পরীক্ষা) | প্রেগনেন্সি: নেগেটিভ | শরীরে গর্ভধারণের কোনো অস্তিত্বই নেই। |
চিকিৎসক দল রক্তের সেরোলজি রিপোর্টের ‘নেগেটিভ’ ফলাফলকে উপেক্ষা করে কেবল আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে রাত ১১টায় জরুরি অস্ত্রোপচার শুরু করেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা ভুক্তভোগীর পরিবারকে জানান, পেটের ভেতরে কোনো ভ্রূণ বা শিশুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি; বরং তীব্র ব্যথার কারণ ছিল ‘অ্যাকিউট অ্যাপেন্ডিসাইটিস’ (Acute Appendicitis)। পরবর্তীতে চিকিৎসকেরা ফ্যালোপিয়ান টিউবের পরিবর্তে অ্যাপেন্ডিক্স কেটে অপসারণ করেন।
পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে অপ্রয়োজনীয়ভাবে একজন নারীর পেট কেটে বড় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে, যা তাঁর ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি বা জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ল্যাপারোটমি ও সিজারিয়ান অপারেশনের মধ্যকার বিভ্রান্তি দূর করতে আল আমিন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ চৌধুরী জানান:
“ডা. নাহিদ সুলতানা আমাদের হাসপাতালে চেম্বার করেন। আল্ট্রাসনোগ্রাম ও লক্ষণ দেখে তিনি একটপিক প্রেগনেন্সি সন্দেহ করেছিলেন। তবে রোগীর কোনো ‘সিজারিয়ান’ অপারেশন হয়নি, পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরি ল্যাপারোটমি করা হয়েছে।
“অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. নাহিদ সুলতানা এই বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। এ বিষয়ে আপনারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
“প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও তদন্ত
উক্ত ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। হাসপাতালটির চিকিৎসাগত গাফিলতি এবং একই দিনে দুটি পরস্পরবিরোধী রিপোর্টের ভিত্তিতে কেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো— তা খতিয়ে দেখতে গত বৃহস্পতিবার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, একটোপিক প্রেগন্যান্সি এবং অ্যাপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণ অনেক সময় কাছাকাছি হলেও, রক্তের Beta-hCG বা সেরোলজি টেস্ট নেগেটিভ আসার পর গর্ভধারণের দাবিতে ল্যাপারোটমি করার সিদ্ধান্তটি বড় ধরনের চিকিৎসা বিভ্রাট (Medical Error) হিসেবে গণ্য হতে পারে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

