back to top

মনোনয়নেই থামল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটে নিশ্চিত হলো বিজয়-চট্টগ্রাম বার দখলে বিএনপিপন্থীরা

প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২৬ ০৫:৪১

চট্টগ্রাম আদালতপাড়ার বাতাসে গত এক সপ্তাহ ধরেই ছিল অস্বস্তি, উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার গন্ধ। কালো পতাকার মিছিল, নির্বাচন বর্জনের ডাক, আদালতের বারান্দাজুড়ে স্লোগান আর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

সব মিলিয়ে বহু পুরোনো ঐতিহ্যের চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি যেন ধীরে ধীরে গড়িয়েছে এক অভূতপূর্ব একতরফা নির্বাচনের দিকে।

শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। সভাপতি থেকে সাধারণ সম্পাদক—সমিতির সব কটি পদেই জয়ী হয়েছেন বিএনপিপন্থী আইনজীবী ঐক্য ফোরামের প্রার্থীরা।

নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতেই বাধার মুখে পড়েছেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী–সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

ফলে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব পুরোপুরি চলে গেল বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের হাতে।

সমিতির সভাপতি পদে আইনজীবী ঐক্য ফোরামের তারিক আহমদ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মো. মঈনুদ্দীন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

একইভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন সিনিয়র সহসভাপতি সেলিমা খানম, সহসাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক আবুল মনছুর সিকদার, পাঠাগার সম্পাদক তৌহিদ হোছাইন সিকদার, সাংস্কৃতিক সম্পাদক বিলকিস আরা মিতু, ক্রীড়া সম্পাদক মো. সরোয়ার হোসাইন লাভলু এবং তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক মো. লোকমান শাহ।

নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, এসব পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় তাঁদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।

সম্পাদকীয় ১০টি পদের মধ্যে ৯টিতেই ভোটের প্রয়োজন হয়নি। কেবল সহসভাপতি পদে ভোটগ্রহণ হয়। সেখানে আইনজীবী ঐক্য ফোরামের নিলুফার ইয়াসমিন লাভলী ১ হাজার ৭৬৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

নির্বাহী সদস্য পদে ঐক্য ফোরাম ও জামায়াত–সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদের মোট ২২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

তবে নির্বাচন বর্জনের পরও ব্যালটে নাম থেকে যাওয়ায় জামায়াতপন্থী প্রার্থীদের বিপরীতে ভোট পড়ে।

শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হন বিএনপি–সমর্থিত ১১ সদস্য—আলী আকবর, দিদারুল আলম, দিলদার আহমেদ ভূঁইয়া, মো. ইকবাল হোসেন, মো. জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ হাসান, মোকতার উদ্দিন, মোমেনুল হক, সাদিয়া খান, সাইফুল ইসলাম ও শেখ মো. ফয়সাল উদ্দিন।

নির্বাচন ঘিরে আদালতপাড়ায় ছিল তীব্র উত্তেজনা। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘একতরফা নির্বাচন আয়োজনের’ অভিযোগ তোলেন।

জামায়াত–সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ ৬ মে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

পরে ১৭ মে নির্বাচন কমিশনার, তফসিল ও নির্বাচন বাতিলের দাবিতে আদালতে মামলা করে তারা। একই সঙ্গে নির্বাচন স্থগিত চেয়ে আবেদনও জানানো হয়।

এর আগে ১৯ মে সংগঠনটি এক তলবি সভার আয়োজন করে। সেখানে নির্বাচনের পক্ষে ভোট পড়ে ২৮৯টি, বিপক্ষে পড়ে ১৭১টি। তবে সেই ভোটাভুটির পরও নির্বাচন বর্জনের অবস্থানেই অনড় থাকে জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা।

গত এক সপ্তাহ ধরে আদালত এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল, কালো পতাকা মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন আওয়ামী লীগ ও জামায়াত–সমর্থিত আইনজীবীরা। নির্বাচনের দিনও আদালতপাড়ায় উত্তেজনা ছিল স্পষ্ট।

অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা দুপুর থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা নির্বাচনী প্রচার ক্যাম্পের সামনে মানববন্ধন করেন।

অন্যদিকে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা শাপলা ভবনের সামনে প্রতিবাদী গান পরিবেশন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন।

মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা রৌশন আরা বেগম জানান, বিএনপি–সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য ফোরামের প্রার্থীরা পূর্ণ প্যানেলে ২১টি পদের সব কটিতে বিজয়ী হয়েছেন।

সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সহসভাপতির একটি ও সদস্যের ১১টি পদে ভোট হয়েছে। সমিতিতে মোট ভোটার ছিলেন ৪ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ হাজার ১৬০ সদস্য।

নির্বাচনকে ‘অটো কমিটি’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এইচ এম জিয়া উদ্দিন বলেন, সমিতির ১৩৩ বছরের ইতিহাসে কখনো ভোটবিহীন বা ‘অটো কমিটি’ গঠনের নজির নেই।

এমনকি করোনাকালেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান নির্বাচন কমিশন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে সমিতির ঐতিহ্য নষ্ট করেছে।

অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম চট্টগ্রামের সদস্যসচিব কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দল–সমর্থিত আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাস্তব পরিবেশ ছিল না। ফলে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগও তৈরি হয়নি।

বিতর্ক, বর্জন আর অভিযোগের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি নতুন নেতৃত্ব পেলেও আদালতপাড়ায় থেকে গেছে এক গভীর প্রশ্ন—এটি কি সত্যিকার অর্থে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার ছায়ায় গড়ে ওঠা একপক্ষীয় ক্ষমতার নতুন অধ্যায়?