যেখানে শিশুদের সোনালী শৈশব কাটার কথা ছিল নির্ভয়ে, খেলনা আর চকলেটের হাসিতে, সেখানে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে নেমে এসেছে এক অন্ধকার অবক্ষয়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি অবোধ শিশুকে ধর্ষণের নির্মম চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এই পৈশাচিকতায় একদিকে যেমন স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো শহর, অন্যদিকে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে স্থানীয় জনতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিমধ্যে এই অপরাধের সাথে জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে, তবে এই ঘটনাগুলো সমাজের নৈতিক ধসের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
চকলেটের লোভ এবং নিরাপত্তারক্ষীর আড়ালে লুকিয়ে থাকা দানব
প্রথম ঘটনাটি ঘটে নগরের ডবলমুরিং এলাকায়। যেখানে নিরাপত্তার চাদরে আগলে রাখার কথা ছিল এক প্রবীণ নিরাপত্তাকর্মীর, সেখানেই ঘটলো উল্টো চিত্র। মো. এহসান (৫৫) নামের এক নিরাপত্তাকর্মী ৭ ও ১১ বছরের দুটি ফুটফুটে শিশুকে ডেকে একটি নির্জন খালি প্লটে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। শিশুদের আর্তনাদে ছুটে আসে স্থানীয় মানুষ। নিজের চোখে এই বর্বরতা দেখে ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তকে গণপিটুনি দেয়। পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন মানুষের ক্ষোভ ছিল আকাশচুম্বী। পরবর্তীতে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে এহসানকে গ্রেপ্তার করে।
“আমরা আমাদের সন্তানদের কোথায় নিরাপদ রাখবো? যাকে আমরা পাহারাদার ভাবছি, সেই যদি শিকারী হয়ে ওঠে?” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা।
একই দিনে, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় ঘটে আরও এক মর্মস্পর্শী ঘটনা। মাত্র পাঁচ বছরের এক অবোধ শিশুকে চকলেট দেওয়ার লোভ দেখিয়ে নিজের লালসার শিকার বানানোর চেষ্টা করে প্রতিবেশী মো. হাসান (৪২)। চকলেট পাওয়ার খুশিতে যে শিশুটি হাসিমুখে এগিয়ে গিয়েছিল, তাকেই শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত ও ট্রমাটাইজড অবস্থায় ভর্তি করতে হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে’ (OCC)। বর্তমানে সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল করিম নিশ্চিত করেছেন যে, ঘাতক হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বাকলিয়ায় রণক্ষেত্র: জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও পুলিশের টিয়ারশেল
এই ঘটনার ঠিক একদিন আগে, গত বৃহস্পতিবার বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় ৪ বছরের এক দেবশিশুকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়। মনির হোসেন (৩০) নামের এক নরপশুকে পুলিশ আটক করতে গেলে স্থানীয় জনতা আর নিজেদের ধরে রাখতে পারেনি। বছরের পর বছর ধরে নারী ও শিশুদের ওপর চলা এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রূপ নেয় গণবিস্ফোরণে।
জনতা দাবি তোলে, এই অপরাধীকে পুলিশের গাড়িতে নয়, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়লে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানায়। এমনকি গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুলিশ যখন কৌশলে আসামিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন উত্তেজিত জনতা পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং থানা ঘেরাও করতে রওনা হয়।
পরবর্তীতে শুক্রবার আদালতে হাজির করা হলে আসামি মনির হোসেন নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে কি এগোচ্ছি আমরা?
চট্টগ্রামের এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো কেবল অপরাধের পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা এবং শিশুদের মানবিক অধিকারের ওপর চরম আঘাত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর আইনের কথা বললেও, বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ মা-বারা আতঙ্কিত।
আজকের এই নিষ্পাপ ভুক্তভোগীদের চোখ ভরা জল আর হাসপাতালের বিছানায় তাদের অসহায় ছটফটানি পুরো মানবতাকে এক কঠিন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত না হলে, এই ক্ষোভের আগুন হয়তো নিভবে, কিন্তু মা-বাবার মনের ভেতরের আতঙ্ক আর কোনোদিন দূর হবে না।

