চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি বড়ুয়া পাড়া। সাধারণ দিনের মতোই রাত নেমেছিল সেখানে। চারদিকে ছিল নিস্তব্ধতা।
গ্রামের মানুষ দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সেই রাতই হয়ে উঠবে একটি পরিবারের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়—এ কথা কেউ জানতেন না।
শনিবার (১৩ জুন) দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা ভেঙে ওঠে আর্তচিৎকারে।
প্রতিবেশীরা ছুটে যান চেনামতি বড়ুয়া পাড়ার সুজন বড়ুয়ার বাড়ির দিকে। সেখানে গিয়ে তারা যে দৃশ্য দেখেন, তা আজও তাদের শিহরিত করছে।
ঘরের দরজার সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন এনি বড়ুয়া (৪০) এবং তার পাঁচ বছরের ছেলে পিয়াস বড়ুয়া। মায়ের শরীর রক্তে ভিজে গেছে। ছোট্ট শিশুটিও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল।
ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই আরও ভয়ংকর দৃশ্য চোখে পড়ে—রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে আছে এনি বড়ুয়ার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার দেহ।
এক মুহূর্তেই যেন থেমে যায় একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন।
প্রতিবেশীরা দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এনি বড়ুয়ার জীবন আর বাঁচানো যায়নি।
ঘটনাস্থলেই নিভে যায় তার জীবনের প্রদীপ। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে উদ্ধার করে প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার মরদেহও।
স্থানীয় বাসিন্দা সুরভী বড়ুয়া বলেন, চিৎকার শুনে তারা বাইরে বেরিয়ে আসেন। প্রথমে মা ও ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে ঘরের ভেতরে গিয়ে মেয়ের মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়তো অন্য কোথাও।
সেই রাতে সুজন বড়ুয়া ছিলেন চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জ এলাকার একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্বে। সংসারের ভবিষ্যৎ গড়তে কর্মস্থলে থাকা মানুষটি জানতেন না, ঠিক তখনই তার নিজের সংসার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।
রাতে স্বজনদের ফোন পেয়ে তিনি বাড়িতে ছুটে আসেন। কিন্তু ফিরে পান না স্ত্রীকে, ফিরে পান না তার কিশোরী মেয়েকে। দেখতে হয় দুটি নিথর দেহ।
শোকাহত সুজন বড়ুয়া দাবি করেছেন, প্রতিবেশী লিমন বড়ুয়া তেজপ্রিয়র সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেন ছিল এবং এ ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, মৃত্যুর আগে তার স্ত্রী লিমন বড়ুয়ার নাম উল্লেখ করেছিলেন।
তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব এখন তদন্তকারী সংস্থার।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী জানিয়েছেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করেছে।
মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান জানান, অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিরা ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এনি বড়ুয়া ও তার মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়াকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। হামলায় আহত হয়েছে পাঁচ বছর বয়সী পিয়াস বড়ুয়াও। তবে তার অবস্থা বর্তমানে গুরুতর নয়।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এক নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে এনির পরিবারের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। নিহতদের স্বজনদের ধারণা, সেই বিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে।
তবে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কারা ঢুকেছিল সেই বাড়িতে? কেন এত নির্মমভাবে হত্যা করা হলো মা ও মেয়েকে? ছোট্ট পিয়াস কেন হামলার শিকার হলো? আর মৃত্যুর আগে সত্যিই কি কোনো নাম বলে গিয়েছিলেন এনি বড়ুয়া?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
অন্যদিকে চেনামতি বড়ুয়া পাড়ার মানুষ এখনো আতঙ্ক ও শোকে স্তব্ধ। যে উঠানে একসময় শিশুদের হাসির শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন শুধুই নীরবতা। যে ঘরে মা-মেয়ের স্বপ্ন ছিল, সেখানে পড়ে আছে রক্তাক্ত স্মৃতি।
এক রাতেই ভেঙে গেছে একটি পরিবার। একজন স্বামী হারিয়েছেন তার জীবনসঙ্গীকে। একজন বাবা হারিয়েছেন তার কিশোরী মেয়েকে। আর পাঁচ বছরের এক শিশু হয়তো বড় হয়ে জানতে পারবে—এক বিভীষিকাময় রাতে তার চোখের সামনে হারিয়ে গিয়েছিল তার পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষগুলো।
হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হলেও হয়তো শেষ হবে না সেই প্রশ্ন—একটি পরিবারের এমন পরিণতি কেন?

