back to top

সিইওবিহীন চসিকের ১০ মাস: প্রশাসনিক বাস্তবতা, দ্বন্দ্বের ছায়া নাকি নিয়োগ জটিলতা?

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ১৩:৪২

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদ প্রায় ১০ মাস ধরে শূন্য।

দেশের অন্যতম বৃহৎ সিটি করপোরেশনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় নানা প্রশ্ন, উদ্বেগ এবং সমালোচনা তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক মহল থেকে শুরু করে সেবাগ্রহীতাদের মধ্যেও।

বর্তমানে চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ সামলানো কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

সূত্র বলছে, গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণে যান তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। প্রশিক্ষণ শেষে ২৩ অক্টোবর কর্মস্থলে যোগ দিতে এলেও তার যোগদানপত্র গ্রহণ করা হয়নি। এরপর ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত মোড় নেয়।

মেয়রের পক্ষ থেকে তাকে বদলির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়, কর্মচারীদের একটি অংশ তার অপসারণের দাবিতে আন্দোলনও করে।

অবশেষে ১৭ নভেম্বর তাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। কিন্তু তার স্থলে নতুন কাউকে নিয়োগ না দেওয়ায় শুরু হয় প্রশাসনিক শূন্যতা।

চসিকের ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, সচিব এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা—দুটি পদই স্বতন্ত্র ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি পদে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক তদারকি ও নীতিগত বিষয় দেখভাল করতে হয়, অন্যদিকে আরেকটি পদে রয়েছে দাপ্তরিক সমন্বয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব।

ফলে একজন কর্মকর্তার পক্ষে দুই পদ সামলানো বাস্তবে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেছেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় ধীরগতির।

যদিও এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সিইও ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন।

তার ভাষ্য, “আমার টেবিলে কোনো ফাইল আটকে থাকে না। আমি সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ফাইল নিষ্পত্তি করি। ফাইল আটকে থাকার অভিযোগ সত্য নয়।”

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, যদি বাস্তবে কোনো সমস্যা না-ই থাকে, তাহলে দীর্ঘ ১০ মাস ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য কেন?

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে দীর্ঘদিন কাজ চালানো হলে কিছু প্রশাসনিক অসুবিধা হওয়া স্বাভাবিক। তবে তারা বলছেন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদায়নের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল একজন কর্মকর্তার বদলি বা নিয়োগের প্রশ্ন নয়; এটি একটি বড় সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক সক্ষমতার বিষয়। কারণ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হচ্ছেন করপোরেশনের প্রশাসনিক প্রধান।

উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জনবল পরিচালনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু কর্মকাণ্ড তার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

এদিকে তৌহিদুল ইসলামকে ঘিরে মেয়র এবং প্রশাসনের মধ্যকার বিরোধের ঘটনাও এখনো আলোচনায় রয়েছে। মেয়রের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ তুলে বদলির সুপারিশ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে প্রশিক্ষণ শেষে যোগদান করতে না দেওয়ার অভিযোগ তুলে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে নিজের অবস্থান জানিয়েছিলেন তৌহিদুল ইসলাম। বিষয়টি তদন্তে দুই সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছিল।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তৌহিদুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার পরও কেন নতুন কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়নি? এটি কি শুধুই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে?

চট্টগ্রাম নগরের নাগরিকদের কাছে অবশ্য এসব প্রশাসনিক টানাপোড়েনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেবা।

নাগরিকরা চান দ্রুত সিদ্ধান্ত, সময়মতো ফাইল নিষ্পত্তি এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি। সেই জায়গা থেকে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকা অনেকের কাছেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

এখন নজর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দিকে। নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কবে নিয়োগ পাবেন, সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কার্যক্রম কত দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে।

কারণ প্রশ্ন একটাই—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন কি আর কতদিন অতিরিক্ত দায়িত্বের ভরসায় চলবে?