দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করতে দেওয়া বন্ড সুবিধা এখন রাজস্ব ফাঁকির অন্যতম বড় উৎসে পরিণত হয়েছে বলে উঠে এসেছে বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাপড়, সুতা ও অন্যান্য কাঁচামাল নির্ধারিত বন্ডেড ওয়্যারহাউজে না গিয়ে সরাসরি চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন খোলাবাজারে। এর ফলে সরকার হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব।
এসবির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রামের টেরিবাজারকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত চক্র দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে আসছে।
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড়, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রী চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রাকে করে রাতের আঁধারে নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় খালাস করা হয়।
রাজধানীর কাছাকাছি চিটাগাং রোড এলাকায় বিভিন্ন আবাসিক ভবনকে অস্থায়ী গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে এসব পণ্য মজুদ রাখা হয়।
পরে সুবিধাজনক সময়ে সেগুলো রাজধানীর ইসলামপুর, সদরঘাটসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি এসবির বিশেষ প্রতিবেদন এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সূত্র-Psp Vision
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা হয় বিভিন্ন ধরনের নিট ফেব্রিক্স, ওভেন ফেব্রিক্স, ডেনিম ফেব্রিক্স, মেস ফেব্রিক্স, কটন সুতা, পলিস্টার সুতা, নাইলন সুতা, ভলকানাইজড রাবার সুতা, বিভিন্ন ধরনের রং, প্যাকেজিং উপকরণ, টেক্সটাইল কেমিক্যাল, শিল্প লবণ, লেবেলিং সামগ্রী, জিপার, বাটন, হ্যাঙ্গার, ইলাস্টিক এবং ব্লেজার-জ্যাকেট তৈরির কাঁচামাল।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো—দেশের গার্মেন্টস খাতের একটি অংশের বিরুদ্ধে সরাসরি চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগ।
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, কিছু অসাধু উদ্যোক্তা মাত্র ২০ থেকে ২৫টি মেশিন স্থাপন করে ভুয়া উৎপাদন সক্ষমতা দেখিয়ে বন্ড সুবিধা গ্রহণ করছে।
পরে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাপড়, সুতা ও অন্যান্য কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে।
শুধু তাই নয়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কমিশনের বিনিময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করছে।
এমনকি যেসব কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও বিভিন্ন কৌশলে সচল রাখা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসবির প্রতিবেদনে বন্ড কমিশনারেটের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
বলা হয়েছে, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কাঁচামালের অনুমোদন নেওয়া, বন্ধ কারখানার নামে রপ্তানির সক্ষমতা দেখানো এবং নিরীক্ষা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার মতো অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে।
নিরীক্ষা বিভাগের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের ফলে বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা পণ্যের সঠিক হিসাব যাচাই হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের অনিয়ম শুধু রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়; এটি দেশের বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যকেও বড় ধরনের প্রতিযোগিতাগত সংকটে ফেলছে।
কারণ শুল্ক ও কর পরিশোধ করে আমদানি করা পণ্যের সঙ্গে করমুক্ত সুবিধায় আসা অবৈধ পণ্য বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বাজারব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে অসম প্রতিযোগিতা।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসবির প্রতিবেদনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বন্ড অটোমেশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে সামঞ্জস্য পর্যবেক্ষণ, বন্ডেড ওয়্যারহাউজে আকস্মিক পরিদর্শন ও নিয়মিত নিরীক্ষা, এলসি পর্যায়ে কাপড়ের নমুনা সংযুক্ত করা এবং অটোমেটেড প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্যের গ্রেড যাচাই করা।
পাশাপাশি গার্মেন্টস উৎপাদনে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু কাপড়, সুতা ও এক্সেসরিজ প্রয়োজন, তা নির্ধারণে এনবিআর, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করার জন্য চালু হওয়া বন্ড সুবিধা যদি চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু রাজস্ব ব্যবস্থাকেই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।
এসবির অনুসন্ধান সেই উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

