বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনও কখনও একটি মুহূর্তই পুরো ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
সান ফ্রান্সিসকোয় তুরস্ক ও প্যারাগুয়ের ম্যাচে সেই মুহূর্তটি এসেছিল খেলা শুরুর মাত্র ৬৫ সেকেন্ডের মাথায়। আর সেই এক গোলই শেষ পর্যন্ত গড়ে দেয় ম্যাচের ফলাফল।
ম্যাচের শুরুতেই গ্যালারির অনেক দর্শক তখনও নিজেদের আসনে ঠিকমতো বসে উঠতে পারেননি। এর মধ্যেই তুরস্কের রক্ষণভাগে আঘাত হানে প্যারাগুয়ে।
ফরোয়ার্ড হুলিও এনসিসোর ফ্লিক থেকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে জাল খুঁজে নেন মিডফিল্ডার মাতিয়াস গালারসা।
মাত্র ৬৫ সেকেন্ডে করা এই গোলেই ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের দ্রুততম গোলদাতার রেকর্ড নিজের নামে লিখিয়ে নেন তিনি।
গোল হজমের পর থেকেই ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে তুরস্ক। একের পর এক আক্রমণে প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগকে চাপে রাখে তারা।
১৩ মিনিটে কেরেম আক্তুরকোগ্লুর কাটব্যাক থেকে সুযোগ পেয়েছিলেন আর্দা গুলের। কিন্তু তাঁর শট গোলবারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
এরপরও থেমে থাকেনি তুরস্ক। ৩১ থেকে ৩৪ মিনিটের মধ্যে হাকান চালহানোগ্লু দুটি ফ্রি-কিক থেকে গোলের সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু দুবারই হতাশ হতে হয় তুর্কি সমর্থকদের।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে ম্যাচে যোগ হয় নতুন নাটক। ৪৫ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়ে তুরস্কের ডিফেন্ডার মের্ত মুলদুরকে কিছু বলেছিলেন প্যারাগুয়ের তারকা ফরোয়ার্ড মিগেল আলমিরোন।
তুর্কি খেলোয়াড়দের আপত্তির পর রেফারি বার্তোন ভিএআরের সহায়তা নেন। পর্যালোচনা শেষে ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয় আলমিরোনকে।
ফলে দ্বিতীয়ার্ধের বড় একটি অংশ ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় প্যারাগুয়েকে। কিন্তু সংখ্যাগত সুবিধা পেয়েও গোলের দেখা পায়নি তুরস্ক।
দেমিরাল, কেনান ইলদিজ ও গুলেরদের নেতৃত্বে আক্রমণের ঢেউ তুললেও প্যারাগুয়ের রক্ষণদুর্গ ভাঙা সম্ভব হয়নি।
অবশ্য প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরলান্ডো হিলকে খুব বেশি কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি।
কারণ সুযোগ তৈরি করেও শেষ মুহূর্তে ফিনিশিংয়ে ব্যর্থ হয়েছে তুরস্ক। ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়িয়েছে, ততই আক্রমণের গতি বাড়িয়েছে তারা।
সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে যোগ করা সময়ের সপ্তম মিনিটে। আর্দা গুলেরের পাস থেকে দুর্দান্ত একটি হেড করেছিলেন ডিফেন্ডার মেরিহ দেমিরাল।
কিন্তু বল লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে হতাশায় ভেঙে পড়েন তিনি। সেই দৃশ্য যেন পুরো তুরস্ক দলেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
কয়েক মিনিট পর শেষ বাঁশি বাজান রেফারি। সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে ফেটে পড়ে প্যারাগুয়ের ডাগআউট। ১-০ গোলের জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে লাতিন আমেরিকার দলটি।
পরিসংখ্যানও ম্যাচের গল্পকে আরও নাটকীয় করে তুলেছে। তুরস্কের বল দখলে ছিল ৭৮ শতাংশ, লক্ষ্য বরাবর নিয়েছে ৬টি শট।
অন্যদিকে প্যারাগুয়ে মাত্র ২২ শতাংশ বল দখলে রেখে লক্ষ্য বরাবর শট নিতে পেরেছে ২টি। তবুও ফলাফল তাদের পক্ষেই গেছে।
এই ম্যাচের আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল দ্রুততম গোলের রেকর্ড। কয়েক ঘণ্টা আগেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৭১ সেকেন্ডে গোল করে রেকর্ড গড়েছিলেন মরক্কোর ইসমায়েল সাইবারি।
কিন্তু সেই রেকর্ড বেশিক্ষণ টেকেনি। সান ফ্রান্সিসকোয় ৬৫ সেকেন্ডে গোল করে গালারসা বিশ্বকাপের নতুন দ্রুততম গোলদাতা হয়ে যান।
এই জয়ে ‘ডি’ গ্রুপে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দুই ম্যাচে দুই জয় ও ৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যারা অস্ট্রেলিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে ইতোমধ্যে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট সমান ৩ হলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় এখন তুরস্ক। টানা দুই ম্যাচে হেরে তারা অবস্থান করছে গ্রুপের তলানিতে।
২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে শুধু জয় পেলেই হবে না, গোল ব্যবধানের হিসাবও রাখতে হবে তাদের। একই সঙ্গে তাকিয়ে থাকতে হবে প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার ম্যাচের দিকেও।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখনও সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে তুরস্কের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন এক পরীক্ষা, আর প্যারাগুয়ের জন্য খুলে গেছে নকআউট পর্বের স্বপ্নের দরজা।

