back to top

সাতকানিয়ার ‘ত্রাস’ যুবলীগ ক্যাডার হাসান মাহমুদ গ্রেপ্তার: ১৭ বছরের অপরাধ সাম্রাজ্যের অবসান

প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬ ২৩:১৪

বিশেষ প্রতিবেদক: 

 দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অশান্ত জনপদ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে একক আধিপত্য বিস্তারকারী, একাধিক হত্যা মামলার আসামি এবং কুখ্যাত যুবলীগ ক্যাডার হাসান মাহমুদকে (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (২২ জুন) সন্ধ্যায় উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের গনিপাড়া এলাকার নিজ বাসভবন থেকে একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত হাসান মাহমুদ আওয়ামী লীগের বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের প্রভাবশালী নেতা তথা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমানের আপন ভাগিনা। এই পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সে এলাকায় একটি সুসংগঠিত সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র (সিন্ডিকেট) গড়ে তুলেছিল।

১৭ বছরের ‘অদৃশ্য শক্তির’ নেপথ্যে: মাদক, অস্ত্র ও চাঁদাবাজি

স্থানীয় বাসিন্দা এবং গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সাতকানিয়া থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পূর্ণ হাতের মুঠোয় রেখেছিল হাসান মাহমুদ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার কথার বাইরে প্রশাসনের যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এই রাজনৈতিক দায়মুক্তির (impunity) সুযোগ নিয়ে সে এবং তার অনুসারীরা প্রকাশ্যেই অত্যাধুনিক অস্ত্রের ব্যবসা এবং মরণনেশা ইয়াবার বিশাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত, যা থেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, হাসান মাহমুদের মূল কাজই ছিল নিরীহ মানুষের জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং লুটপাট। তার অপরাধের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে সপরিবারে এলাকা ছাড়া করা হতো। এমনকি অতীতে কেউ থানায় অভিযোগ করতে গেলে উল্টো হাসান মাহমুদের প্রভাবে ভুক্তভোগীকেই পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হতো।

“তার ভয় এতটাই তীব্র ছিল যে মানুষ প্রকাশ্যে তার নাম উচ্চারণ করতেও কাঁপত। কোনো আইনি সংস্থাই তার এই অদৃশ্য শক্তির বলয় ভাঙতে পারছিল না।” — এক স্থানীয় ভুক্তভোগী।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নৃশংসতা

 সূত্রমতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে হাসান মাহমুদ ও তার সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি মাঠে নেমেছিল। গত জুলাইয়ে সাতকানিয়া ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলে প্রকাশ্য দিবালোকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গুলি বর্ষণ এবং নৃশংস গণহত্যা চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এই ক্যাডারের বিরুদ্ধে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও সে কৌশলে ভোল পাল্টে এবং স্থানীয় কিছু অস্ত্রধারীকে হাত করে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

যেভাবে এলো সাফল্য

সাতকানিয়া থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম এবং সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকীর দূরদর্শিতা ও নিরলস প্রচেষ্টায় অবশেষে এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম জানায়, দীর্ঘদিন ধরে হাসান মাহমুদকে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারিতে (intelligence surveillance) রাখা হয়েছিল। সোমবার সন্ধ্যায় নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে পুলিশ পরিদর্শক ও উপ-পরিদর্শকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ টিম খাগরিয়ার গনিপাড়ায় তার গোপন আস্তানায় হানা দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ ও গ্রেপ্তার করে।

আসামির পরিচিতি ও অপরাধের খতিয়ান
নাম ও বয়সহাসান মাহমুদ (৪৫)
পিতার নাম ও ঠিকানাশামসুল ইসলাম, গনিপাড়া, খাগরিয়া, সাতকানিয়া
রাজনৈতিক পদবিকার্যনির্বাহী সদস্য, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবলীগ
মামলার সংখ্যাহত্যা, হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও হামলসহ ৬টিরও বেশি মামলা
বর্তমান স্থিতিগ্রেপ্তার এবং বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে রিমান্ড চেয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলমান

জনমনে স্বস্তি, রিমান্ডের দাবি

হাসান মাহমুদ গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাতকানিয়ার সাধারণ মানুষের মাঝে দীর্ঘ ১৭ বছর পর স্বস্তি ও আনন্দের আবহ দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহল দাবি জানিয়েছেন, এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে রিমান্ডে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার অপরাধ চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সন্ধান এবং তার লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের বড় চালান উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, সাতকানিয়া তথা সমগ্র চট্টগ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সন্ত্রাস দমনে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। হাসান মাহমুদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পরবর্তী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।