back to top

চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়োগে উঠছে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন

তথ্য অধিকারেও মিলছে না তথ্য

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬ ১০:৩২

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) ১ম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে সনদের বৈধতা, নিয়োগ যাচাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া কয়েকজন প্রার্থীর যোগ্যতা ও সনদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই না করে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

প্রাপ্ত নথিপত্র, অভিযোগপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১ম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

চলতি বছরের ৮ এপ্রিল লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে, ৬ এপ্রিল, তা স্থগিত করা হয়। এরপর নিয়োগ কার্যক্রম নতুন প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়া শুরু হয়।

এই নিয়োগকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রার্থী মো. তৌহিদুল ইসলাম ও ইমাম হোসেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার জহিরুল ইসলামের নিকটাত্মীয়। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের লস্কর পদে কর্মরত মো. তৌহিদুল ইসলামের ৩য় শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার যোগ্যতা সনদের তথ্য যাচাই করতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় নৌপরিবহন অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়।

তাদের দাবি, সনদ ইস্যু ও যোগ্যতা অর্জনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাকালে একাধিক অসঙ্গতির বিষয় তাদের নজরে আসে।

এ নিয়ে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছেও লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

অভিযোগকারীরা আরও বলেন, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় একাধিক আবেদন ও আপিল করা হলেও তারা প্রত্যাশিত তথ্য পাননি। তাদের অভিযোগ, তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা থাকায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসন বিভাগ থেকে তৌহিদুল ইসলামকে ইনল্যান্ড মাস্টার পদে নিয়োগসংক্রান্ত একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। যদিও এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “আমি সকল নিয়মকানুন মেনে আবেদন করেছি। আমার সব সনদপত্র সঠিক আছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করেই আমার আবেদন গ্রহণ করেছে।”

অন্যদিকে অভিযোগের আরেক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমানে ২য় শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার পদে কর্মরত ইমাম হোসেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, তার ১ম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার যোগ্যতা সনদ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বৈধতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে মালয়েশিয়া থেকে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট অব রেকগনিশন (COR) এবং সংশ্লিষ্ট যোগ্যতার নথি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তাদের দেওয়া নথি অনুযায়ী, বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।

তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান ইমাম হোসেন। তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আপনাকে কোনো তথ্যও দিতে পারব না।”

অভিযোগকারীদের সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন নিয়োগের যাচাই প্রক্রিয়া ঘিরে। তাদের ভাষ্য, ১ম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার নিয়োগে প্রার্থীদের সনদ ও কাগজপত্র যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর।

কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যরা যখন প্রার্থী হন, তখন সেই যাচাই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

অভিযোগকারীরা বলছেন, সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যাচাই প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তাদের দাবি, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বাধীন তদন্তের আওতায় এনে সনদ, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং যাচাই কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনল্যান্ড মাস্টার পদ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক পদ নয়। একজন ইনল্যান্ড মাস্টারের সিদ্ধান্ত ও দক্ষতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নৌযান চলাচল, নৌনিরাপত্তা, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বার্থ।

ফলে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর সনদ, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা নিয়ে সামান্যতম প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীরা মনে করেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু নিয়োগপ্রাপ্ত নয়, নিয়োগপ্রত্যাশী সকল প্রার্থীর নথিপত্রও স্বাধীনভাবে যাচাই করা উচিত।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের একান্ত সচিব এস. এম. আশিকুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন)-এর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

তথ্য অধিকার আইনের আবেদন ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনেল অফিসার নাসির উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

একইভাবে অভিযোগের বিষয়ে হারবার মাস্টার জহিরুল ইসলামের বক্তব্য জানার জন্য বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে সনদের বৈধতা, তথ্যপ্রাপ্তির জটিলতা, সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এবং যাচাই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষাপটে অভিযোগকারীরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌপরিবহন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের বক্তব্য, অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—সেটি নির্ধারণের একমাত্র পথ হলো স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত।

কারণ দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নিয়ে যেকোনো প্রশ্ন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং জনস্বার্থ ও নৌনিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট।