back to top

৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলা, হাজারো প্রাণহানির আশঙ্কা

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬ ০৩:৪৯

মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রিখটার স্কেলে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার এই জোড়া ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বহু ভবন ধসে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

আতঙ্কিত হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার ভেনেজুয়েলার পশ্চিমাঞ্চলে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বিকেল ৬টা ৪ মিনিটে ইয়ারাকুই রাজ্যে ২১ দশমিক ৯ কিলোমিটার গভীরে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়।

এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর ইউমারে শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ভূগর্ভের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি।

ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই জোড়া ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

সংস্থাটির পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৪৪ শতাংশ এবং নিহতের সংখ্যা এক লাখের বেশি হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৩০ শতাংশ।

একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিধস এবং সমতল এলাকায় মাটির তারল্য বা লিকুইফেকেশনের ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পরপরই ভেনেজুয়েলার উপকূল এবং নিকটবর্তী আরুবা ও বোনাইর দ্বীপপুঞ্জের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।

তিনি দুর্গত এলাকায় দ্রুত সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধারকারী দল মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং জনগণকে শান্ত থাকার পাশাপাশি সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়ো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ভিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, রাজধানী কারাকাসের বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভবনের দেয়ালে বড় ধরনের ফাটল এবং কয়েকটি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে।

মন্ত্রী বলেন, কারাকাস ছাড়াও ত্রুহিলিও, ইয়ারাকুই, কারাবোবো, আরাগুয়া, মিরান্দা এবং লা গুয়াইরা রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজধানীর লস পালোস গ্রান্দেস ও আলতামিরা এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ১৯৬৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পেও এই এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির এক আলোকচিত্রে কারাকাসের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক ভবনকে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখা গেছে।

ভূমিকম্পের কম্পন শত শত কিলোমিটার দূরের প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতাতেও অনুভূত হয়েছে।

সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ভূমিকম্পের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন।

বিবিসির সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার বলেন, জীবনে এত শক্তিশালী কম্পন তিনি আগে অনুভব করেননি।

সাততলার ফ্ল্যাটে অবস্থান করার সময় তাঁর মনে হচ্ছিল পুরো ভবনটি বুঝি ভেঙে পড়বে।

পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্টিনেজ রয়টার্সকে বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দে সবকিছু কাঁপতে শুরু করে।

ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র ও ফ্রিজের জিনিসপত্র মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। ভবনের বিভিন্ন দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।’

মারিয়া রোমেরো নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের কথা শুনেছি। কিন্তু এবারের কম্পন তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ মনে হয়েছে।’

উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ শতাধিক উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা আংশিক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার অভিযান জটিল হয়ে উঠেছে।

ভূমিকম্পটি আঘাত হানে ভেনেজুয়েলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ছুটির দিনে। স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা সিমন বলিভারের নেতৃত্বে ১৮২১ সালের ঐতিহাসিক কারাবোবো যুদ্ধের বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে সরকারি ছুটি ছিল।

ফলে বহু মানুষ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘরে অবস্থান করছিলেন, যা হতাহতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় দুর্গত মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এই কঠিন সময়ে আমার হৃদয় ও প্রার্থনা ভেনেজুয়েলার প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে রয়েছে।’

ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এবং হতাহতের সংখ্যা জানতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।