২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ের রূপকথা শেষ ৩২-এ থেমে থাকেনি। ডালাস স্টেডিয়ামে নাটকীয় এক লড়াইয়ে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর বাধা টপকে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি।
জয়ের নায়ক আর্লিং হালান্ড, আর শেষ মুহূর্তের ত্রাতা গোলরক্ষক ওরহান নাইলান্ড। এবার তাদের সামনে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই গোলের জন্য মরিয়া ছিলেন হালান্ড। তৃতীয় মিনিটেই বক্সের মাঝখান থেকে তাঁর হেড ব্লক হয়ে যায়।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে নিশ্চিত গোল থেকে তাঁকে বঞ্চিত করেন আইভরি কোস্টের এক ডিফেন্ডার। এর আগে তাঁর আরেকটি ট্রেডমার্ক হেড দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক ফোফানা।
হালান্ড গোল না পেলেও প্রথমার্ধে এগিয়ে যায় নরওয়ে। ৩৯ মিনিটে মার্টিন ওডেগার্ডের নিখুঁত পাস থেকে বক্সের বাঁ দিকে বল পেয়ে কয়েকজনকে কাটিয়ে ডান পায়ের কোণাকুণি শটে গোল করেন আন্তোনিও নুসা।
বিশ্বকাপে নরওয়ের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন তিনি। সেই এক গোলেই বিরতিতে এগিয়ে যায় ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপে ফেরা ইউরোপিয়ান দলটি।
এই ম্যাচে ওডেগার্ডও গড়েছেন অনন্য এক কীর্তি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে নিজের প্রথম তিন ম্যাচেই অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।
এর আগে ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ইগোর বেলানোভ এবং ২০০২ সালে জার্মানির মাইকেল বালাক এই কীর্তি গড়েছিলেন।
অন্যদিকে গোলের জন্য মরিয়া ছিল আইভরি কোস্টও। ২১ মিনিটে ঘিসলাইন কোনানের শট বাইরের জালে লাগে। সাত মিনিট পর নিকোলাস পেপের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
৩৫ মিনিটে এমানুয়েল আগবাদুর দূরপাল্লার শট রুখে দেন ওরহান নাইলান্ড। প্রথমার্ধের শেষ দিকে আরেকটি হেডও অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে আফ্রিকান দলটি। ৫৫ মিনিটে নিকোলাস পেপের দুর্দান্ত শট কাছের পোস্টে অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন নাইলান্ড।
দুই মিনিট পর ফ্রাঙ্ক কেসির শটও ডানদিকের নিচু কোণায় ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক।
৬৭ মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ হয় নরওয়ে। কর্নার থেকে আলেকজান্ডার সরলথের ফ্লিকের পর হেগেম চার গজ দূর থেকে ভলি নিলেও গোললাইন থেকে বল ফিরিয়ে দেন আমাদ দিয়ালো।
সেই দিয়ালোই ৭৪ মিনিটে ম্যাচে ফেরান আইভরি কোস্টকে। ডান প্রান্ত থেকে নিকোলাস পেপের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে বক্সে ঢুকে এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে কোণাকুণি শটে নাইলান্ডকে পরাস্ত করেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই উইঙ্গার।
কয়েক মিনিট আগেই যিনি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়েছিলেন, তিনিই এবার গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। তবে সমতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
৮৬ মিনিটে অস্কার ববের ডিফেন্স-চেরা পাস থেকে প্যাট্রিক বার্গ কাট-ব্যাক করেন। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকা আর্লিং হালান্ড খুব কাছ থেকে আলতো ছোঁয়ায় বল জালে পাঠিয়ে নরওয়েকে আবারও এগিয়ে দেন। নরওয়ের জার্সিতে এটি তাঁর ৫৩ ম্যাচে ৬০তম গোল এবং চলতি বিশ্বকাপে পঞ্চম গোল।
শেষ মুহূর্তে নরওয়ের জয় নিশ্চিত করেন ওরহান নাইলান্ড। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে আমাদ দিয়ালোর প্রায় ৩০ গজ দূরের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক উড়ে গিয়ে এক হাতে কর্নারের ওপর দিয়ে বাইরে পাঠান তিনি। নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে নরওয়ের নায়ক হয়ে ওঠেন এই গোলরক্ষক।
পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচে আধিপত্য ছিল আইভরি কোস্টেরই। তারা মোট ১৪টি শট নেয়, যেখানে নরওয়ের শট ছিল ৯টি। তবে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন নাইলান্ড।
আগামী ৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে নরওয়ে।
বিশ্বকাপে এর আগেও শেষ ষোলোতে উঠেছিল নরওয়ে। ১৯৯৮ সালে ইতালির কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।
তবে সেই একই আসরে গ্রুপ পর্বে ২-১ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে চমকে দিয়েছিল তারা।
ইতিহাসও নরওয়ের পক্ষেই কথা বলছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে চার দেখায় একবারও হারেনি তারা—দুটি জয় ও দুটি ড্র।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে তোরে আন্দ্রে ফ্লো ও কেতিল রেকদালের গোলে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল নরওয়ে। ব্রাজিলের হয়ে একমাত্র গোল করেছিলেন বেবেতো।
১৯৮৮ সালে দুই দল ১-১ গোলে ড্র করে। ১৯৯৭ সালের ৩০ মে প্রীতি ম্যাচে নরওয়ে জেতে ৪-২ ব্যবধানে। সবশেষ ২০০৬ সালের আগস্টে দুই দলের লড়াই ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল।
এবার সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখার সুযোগ হালান্ডদের সামনে। প্রশ্ন একটাই—ব্রাজিলের বিপক্ষে নিজেদের অপরাজিত রেকর্ড কি ধরে রাখতে পারবে নরওয়ে?

