টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত রাঙামাটি,পাহাড়ধসের আশঙ্কা: পৃথক ঘটনায় দুই মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ জুলাই, ২০২৬ ১৭:২৬

নিম্নচাপের প্রভাবে টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে রাঙামাটির মানুষের।

কোথাও পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসের আশঙ্কা, কোথাও বিদ্যুতের ঝুঁকি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাণহানির বেদনাও।

মঙ্গলবার পৃথক দুই ঘটনায় এক বৃদ্ধ ও এক দিনমজুরের মৃত্যু হয়েছে।

একই সঙ্গে টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জেলা প্রশাসন।

সকাল থেকেই পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাঠে কাজ করছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, রেড ক্রিসেন্ট ও রোভার স্কাউটের সদস্যদের।

সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে।

এখনো আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম হলেও সকাল থেকে কিছু পরিবার সেখানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম লাল্যাঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে লক্ষী বিলাস চাকমা (৭০) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হন। তিনি ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ের মাটি অনেকটাই নরম হয়ে পড়েছিল।

দুপুরে হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়লে লক্ষী বিলাস চাকমা মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করলেও ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

অন্যদিকে একই দিন সকাল ১১টার দিকে রাঙামাটির লংগদু উপজেলার মহাজনপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির বিদ্যুতের সংযোগ লাইনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বেনসন চাকমা (৩০) ওরফে বদক্যা চাকমার মৃত্যু হয়।

তিনি পেশায় দিনমজুর এবং উপজেলার মহাজনপাড়া এলাকার নীল কান্তি চাকমার ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সকালে নিজ বাড়ির বিদ্যুতের লাইনে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন বেনসন চাকমা। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

লংগদু থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাকারিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে পুলিশ অবগত রয়েছে এবং এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা রুজুর প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে একই সময়ে জেলা সদরের পৌরসভার শিমুলতলী এলাকায় একটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।

তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে ঝুঁকিতে থাকা মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।

টানা মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ২০১৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের পুনরাবৃত্তি এড়াতে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।

নিয়মিত মাইকিং করে পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট, রোভার স্কাউট এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি বলেন, বৈরী আবহাওয়ায় সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাঠপর্যায়ে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষকে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে অবস্থান না করার পাশাপাশি বিদ্যুতের সংযোগ বা লাইনে কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে দক্ষ ব্যক্তির সহায়তা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

লাগাতার বৃষ্টিপাতের কারণে গত রোববার থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন ও রাঙামাটি পৌরসভা।

প্রশাসন শহরের ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। একইভাবে কাউখালী ও কাপ্তাই উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকেও বাসিন্দাদের সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার কাজ চলছে।

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রাঙামাটি শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ পরিবারের প্রায় ৭০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

অন্যদিকে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া আরটিএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে ২০ পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুরা অবস্থান করছেন।

প্রশাসনের আশঙ্কা, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জন্য বাসিন্দাদের প্রতি আবারও আহ্বান জানানো হয়েছে।