চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার হাজীপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে প্রতিদিনের মতোই বেরিয়েছিলেন পেশায় রিকশাচালক আকবর হোসেন (৫০)।
পরনে ছিল সাধারণ শার্ট ও প্যান্ট। পরিবারের সদস্যদের কাছে সেটি ছিল আর দশটি দিনের মতোই স্বাভাবিক একটি বিকেল।
কিন্তু সেই বের হওয়াই যেন হয়ে উঠল এক অজানা যাত্রা। ১৭ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো ঘরে ফেরেননি তিনি। তাঁর কোনো খোঁজও মেলেনি।
এই দীর্ঘ অপেক্ষা এখন পরিণত হয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা আর অশ্রুসিক্ত প্রতীক্ষায়।
আকবর হোসেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের কঞ্জুরী গ্রামের প্রয়াত জাকের হোসেনের ছেলে।
দুই ছেলে ও দুই মেয়েসহ চার সন্তানের জনক এই রিকশাচালকের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিবার এখন দিশেহারা।
পরিবার জানায়, গত ২৭ জুন বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি আকবর।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ২ জুলাই তাঁর বড় ছেলে আসলাম হোসেন ইমন বায়েজিদ বোস্তামী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপরই তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
তদন্তের একপর্যায়ে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পারে, আকবরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি সর্বশেষ ফেনী এলাকায় সচল ছিল। এরপর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই তথ্যকে কেন্দ্র করেই এগোতে থাকে তদন্ত।
এদিকে ফেনীতে একটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে পুলিশ নিখোঁজের ছেলে আসলাম হোসেন ইমনকে নিয়ে সেখানে যায়।
তবে শেষ পর্যন্ত স্বস্তির খবরই মেলে, উদ্ধার হওয়া মরদেহটি আকবর হোসেনের ছিল না।
নিখোঁজ আকবরের শ্যালক দিদার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “অনেক দিন হয়ে গেল দুলাভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই। আমরা সম্ভাব্য সব জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু কোথাও তাঁর সন্ধান পাইনি।
ভাগিনা ইমনকে নিয়ে পুলিশ ফেনীতে একটা লাশ দেখতে গিয়েছিল, কিন্তু ওটা আমার দুলাভাইয়ের লাশ ছিল না। পুলিশ আমাদের জানিয়েছে, দুলাভাইয়ের মোবাইলটি ট্র্যাক করে সর্বশেষ ফেনী পর্যন্ত খোলা পাওয়া গিয়েছিল, এরপর থেকে ওটা বন্ধ।”
দিন যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে পরিবারের উৎকণ্ঠা। নিখোঁজের ১৭ দিন পার হলেও তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় অনিশ্চয়তায় ভুগছেন স্বজনরা।
বাবার অপেক্ষায় থাকা বড় ছেলে আসলাম হোসেন ইমন বলেন, “আমার বাবা গত ২৭ জুন বিকেলে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন।
১৭ দিন পেরিয়ে গেছে, অথচ এখনো আমরা কোনো খোঁজ পাইনি। বাবার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় আমরা পুরো পরিবার চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছি।”
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বায়েজিদ বোস্তামী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাজেদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, “নিখোঁজ আকবর হোসেনের সন্ধানে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে প্রযুক্তিগত তদন্তে বড় কোনো ক্লু পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মোবাইলটি সর্বশেষ ফেনী এলাকা পর্যন্ত সচল ছিল, এরপর বন্ধ হয়ে যায়। সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো, নিখোঁজ হওয়ার আগে ওই মোবাইল থেকে সন্দেহভাজন বা বিশেষ কারও সঙ্গে তাঁর কোনো কথা বলার রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
ফলে আমাদের তদন্তে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরেও আল্লাহ ভরসা, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।”
এদিকে থমকে আছে আকবর হোসেনের পরিবারের জীবন। প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত কাটছে একটাই প্রত্যাশায়-হয়তো দরজায় কড়া নাড়বেন তিনি, ফিরে আসবেন পরিচিত সেই মানুষটি।
পরিবার ও স্বজনদের একটাই আকুতি-যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি আকবর হোসেনের সন্ধান পেয়ে থাকেন বা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেন, তাহলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অথবা তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
