মাথার ওপর ঘুরছিল মৃত্যু, ২০০ মিটারে আছড়ে পড়েছিল ক্ষেপণাস্ত্র!

হরমুজ প্রণালির মৃত্যুকূপ জয় করে দেশে ১৭ নাবিক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬ ১৪:৩১

মাথার ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে উড়ে যাচ্ছে একের পর এক প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র। মাত্র ২০০ মিটার দূরে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছে অন্য জাহাজ। চারপাশের নীল জলরাশিতে ভেসে বেড়াচ্ছে ভাসমান মাইন আর ড্রোন।

আধুনিক অটো-ন্যাভিগেশন ব্যবস্থাও হঠাৎ অকেজো! ঠিক এমন এক মৃত্যুর উপত্যকায় টানা ১১৫ দিন জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকেরা।

সব আশঙ্কা ও আতঙ্কের প্রহর পেরিয়ে অবশেষে স্বদেশের নিরাপদ মাটিতে পা রেখেছেন তারা।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটে এমিরেটসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন ১৭ জন বীর নাবিক।

এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে নতুন ক্রু দলের কাছে জাহাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে দেশের পথ ধরেন তারা।

চোখের সামনে আছড়ে পড়ছিল ক্ষেপণাস্ত্র

সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা স্মরণে এনে জাহাজের মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান শিউরে উঠে বলেন, শত শত ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের জাহাজের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে।

জেবেল আলি বন্দরে অবস্থানকালে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। চারদিকে শুধু আগুন আর ধোঁয়া।

চরম মৃত্যুর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করতে জাহাজ ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যাইনি।

জাহাজের সেকেন্ড অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন জানান সেই কঠিন সময়ের কারিগরি চ্যালেঞ্জের কথা।

হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় ড্রোন ও মাইন আতঙ্কের মধ্যেই হঠাৎ অকেজো হয়ে পড়ে জাহাজের অটো-ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা।

চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজেদের মেধা ও সাহসিকতাকে সম্বল করে ম্যানুয়াল (হাতে চালিত) পদ্ধতিতে জাহাজ চালিয়ে বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দেন তারা।

দূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তায় সফল উদ্ধার

বিএসসি সূত্র জানায়, যুদ্ধ শুরু হলে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিকসহ জাহাজটি পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে।

বিএসসি-এর জাহাজ-জনবল বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান জানান, দীর্ঘ সংকটকালে নাবিকদের মানসিক শক্তি জোগাতে উচ্চগতির ইন্টারনেট, উন্নত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল।

সংঘাতের পারদ কিছুটা নামতেই বিএসসি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক দ্রুত জাহাজ সরিয়ে নেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।

আর সরকার ও বিএসসি-এর নিবিড় কূটনৈতিক তদারকিতে গত ২৩ জুন সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয় জাহাজটি।

ঘটনার সূত্রপাত গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে। কাতারের মেসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে হঠাৎ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ পারস্য উপসাগর।

দীর্ঘ ১১৫ দিনের রক্তহিম করা প্রহর শেষে জাহাজটি ৩৭ হাজার ৫০০ টন সার নিয়ে সফলভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে পৌঁছায়।

সেখানে নতুন ১৭ জন ক্রু দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যারা শিগগিরই জাহাজটি নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

আর যেসব নাবিকরা জীবন বাজি রেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করে দেশে ফিরেছেন-তাদের বুকে এখন একটাই অনুভূতি: স্বদেশের মাটিতে শান্তিতে শ্বাস নেওয়ার আনন্দ।