বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নেতৃত্বে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়।
দীর্ঘ প্রায় চার দশকের বর্ণাঢ্য সামরিক জীবন, দেশ-বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও স্টাফ দায়িত্ব, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অভিজ্ঞতা এবং কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে ঢাকা সেনানিবাসস্থ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমকে ভাইস অ্যাডমিরাল পদমর্যাদার র্যাঙ্ক ব্যাজ পরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম. নাজমুল হাসান তাকে এই র্যাঙ্ক ব্যাজ পরিয়ে দেন।
অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।
জবাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. শাহীনুর রহমান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিক এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান রুমন।
চার দশকের অভিজ্ঞতায় নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়
ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে তিনি এক্সিকিউটিভ শাখায় কমিশন লাভ করেন।
কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি রয়্যাল মালয়েশিয়ান নৌবাহিনীতে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে সামরিক দক্ষতার পাশাপাশি জ্ঞান ও পেশাগত উৎকর্ষ অর্জনেও তিনি রেখেছেন স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর।
দেশ-বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা ও সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি তিনি মেরিটাইম গভর্ন্যান্স বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
প্রায় ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড, স্টাফ ও প্রশিক্ষণমূলক দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করেছেন তিনি।
দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ এই পথচলায় অর্জন করেছেন সমুদ্র ও নৌ-নিরাপত্তা বিষয়ে বিস্তৃত বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের বহুমাত্রিক দক্ষতা।
যুদ্ধজাহাজের কমান্ড থেকে নৌ একাডেমির নেতৃত্ব
কর্মজীবনে ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি কমান্ডার চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চল, কমান্ডার ঢাকা নৌ অঞ্চল, কমান্ডার সাবমেরিন এবং কমান্ড্যান্ট বাংলাদেশ নেভাল একাডেমিসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
এ ছাড়া নৌ সদর দফতরে পরিচালক নৌ অপারেশনস এবং পরিচালক নৌ পরিকল্পনা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ ও নৌঘাঁটির অধিনায়কত্ব করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে নৌবাহিনীর অপারেশন, প্রশাসন, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা ও সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
নৌবাহিনীর গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমের কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার দায়িত্ব পালন।
লেবানন ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তার পেশাগত জীবনে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা।
সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার এই অভিজ্ঞতা তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
কূটনীতির মঞ্চেও রেখেছেন দক্ষতার ছাপ
সামরিক জীবনের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম।
সর্বশেষ তিনি ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ ও ওমানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
একই সঙ্গে ওমানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
ফলে সমুদ্রসীমা রক্ষা ও নৌ-অপারেশনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে নৌবাহিনীর নতুন প্রধানের ঝুলিতে।
অর্জনের স্বীকৃতিও কম নয়
প্রায় ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম নৌবাহিনী পদক (এনবিপি), নৌ-পারদর্শিতা পদক (এনপিপি), জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
দীর্ঘ এই কর্মজীবনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন, দেশ-বিদেশে সামরিক ও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ এবং কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাকে নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য একটি বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
এবার সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পেশাদারিত্ব ও নেতৃত্বের দক্ষতা নিয়েই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাল ধরলেন ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম।
তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সামনে আরও দক্ষ, আধুনিক ও সক্ষমতার পথে এগিয়ে যাবে-এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।
