গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার মাত্র আট দিনের মাথায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হলো পুরো বসতঘর! আদালতের রায়, স্থানীয় সালিশ-কোনো কিছুই ঠেকাতে পারল না অপরাধীদের দাপট।
চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলায় ৬৮ বছর বয়সী এক অসহায় বিধবার বসতবাড়িতে ঘটে যাওয়া একের পর এক এমন ঘটনা স্থানীয়দের মনে তুলে দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
জমি দখলের জেরে পরিকল্পিতভাবে কি নিঃস্ব করা হচ্ছে এই পরিবারটিকে? আসল ঘটনাটি ঠিক কী?
উপজেলার ৯ নম্বর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিঠাছড়া এলাকার ‘দুলালের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত স্থানেই এই ঘটনার নেপথ্য।
২০১৫ সালে স্বামী অমরন্দু দাশ রায় ওরফে দুলালের মৃত্যুর পর থেকে তিন মেয়েকে নিয়ে স্বামীর তফসিলভুক্ত ভিটা আঁকড়ে ধরে বসবাস করছেন প্রনতি রানী দাশ রায় (৬৮)।
কিন্তু প্রনতি রানীর অভিযোগ, প্রতিবেশীদের চোখ পড়েছিল স্বামীর রেখে যাওয়া এই সহায়-সম্পত্তির ওপর।
বিষয়টি নিয়ে আদালত প্রনতি রানীর পক্ষে রায় দেওয়া সত্ত্বেও এবং বারবার স্থানীয়ভাবে সালিশ করা হলেও তা তোয়াক্কা করেনি প্রভাবশালী প্রতিবেশী চক্রটি।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঘটনার নতুন মোড় নেয়। প্রনতি রানীর দাবি, প্রতিবেশী চোটন কর্মকার (৩৭), মো. সোহেল, আজিম উদ্দিন ও আজাদ হোসেন সংঘবদ্ধ হয়ে জোরপূর্বক তার লাগানো গাছপালা কেটে নিয়ে যায়।
ওই দিনই প্রনতি রানী সুবিচারের আশায় মিরসরাই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পর আট দিন পার হয়ে গেলেও কোনো এক অজানা কারণে পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্তের জন্য যায়নি কিংবা কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়নি।
পুলিশের এই নীরবতার মাঝেই স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেন মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব গাজী নিজাম উদ্দীন। উভয় পক্ষকে নিয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) একটি সামাজিক বৈঠকের দিন ধার্য ছিল।
গাজী নিজাম উদ্দীন জানান, দুই পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি এবং আমার পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি নিয়ে কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সমাধানের কথা ছিল। প্রনতি রানী বৈঠকে এলেও অপর পক্ষের চোটন কর্মকার উপস্থিত হননি।
এর পরেই ঘটে সেই ভয়াবহ ঘটনা। শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে প্রনতি রানীর বসতঘরে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রনতি রানী বলেন, গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি।
এখন রাতের আঁধারে আমার ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হলো। দুটি ঘটনা একই চক্র ঘটিয়েছে। ওদের উদ্দেশ্য আমাকে উচ্ছেদ করে জমি দখল করা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত চোটন কর্মকার। তিনি বলেন, বৈঠক সম্পর্কে আমি জানতাম না। সম্পত্তির মূল বিরোধ হচ্ছে সুমনের সঙ্গে প্রনতি রানীর। সুমনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে আমি সমাধানের জন্য সম্পৃক্ত হয়েছিলাম। এখন আমাকে অযথা অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
এদিকে মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদা ইয়াসমিন জানান, ঘর আগুন দেওয়ার বিষয়ে তিনি এখনো লিখিত অভিযোগ পাননি।
আর গাছ কাটার অভিযোগের বিষয়ে মিটিংয়ে থাকায় তাৎক্ষণিক কিছু বলতে না পারলেও তিনি বলেন, “ঘটনাস্থলে দ্রুত পুলিশ পাঠিয়ে তদন্ত করা হবে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া এবং পরবর্তীতে রাতের আঁধারে ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার এই যোগসূত্র স্পষ্টতই এক গভীর চক্রান্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আদালতের নির্দেশ ও সামাজিক সালিশ অমান্য করে চলা এই অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
