চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ডাকাতি ও চুরির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।
গত কয়েক দিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বসতবাড়ি ও নির্মাণাধীন শিল্পকারখানায় ডাকাতি-চুরির ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনায় স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, একটি ঘটনায় ডাকাতদের বাধা দিতে গিয়ে এক বৃদ্ধ কুপিয়ে আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি নির্মাণাধীন কারখানায় ডাকাতির ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ধারাবাহিক এসব ঘটনায় আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল ও বাজারকেন্দ্রিক রাতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ সোমবার দিবাগত রাতে উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী গ্রামের এক প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, রাতের নীরবতা ভেঙে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র ডাকাতদল বাড়িতে ঢুকে পড়ে।
তারা ঘরের দরজা ভেঙে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। এরপর প্রবাসী দুই ভাইয়ের ঘরে ঢুকে আলমারি ও ওয়্যারড্রপ তল্লাশি চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ ভরি স্বর্ণালংকার, নগদ আড়াই লাখ টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়।
এ সময় ডাকাতদের বাধা দিতে গেলে বাড়ির নুরুল আলমকে কুপিয়ে আহত করা হয়।
নুরুল আলম বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে আমি ছাড়া কোনো পুরুষ নেই। সবাই প্রবাসে। রাতে ১৫ থেকে ২০ জন লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়িতে ঢুকে আমার দুই ছেলের ঘরের দরজা ভেঙে আলমারি ও ওয়্যারড্রপ তল্লাশি করে স্বর্ণ, টাকা ও মোবাইল নিয়ে যায়।
আমি বাধা দিতে গেলে আমাকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে এবং মাথায় অস্ত্র ধরে রাখে।’
পরিবারের সদস্য সাহেলা আক্তার সুমি জানান, ডাকাতরা বেলকনির দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে তাকে বেঁধে ফেলে। পরে সন্তানদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়।
আরেক ভুক্তভোগী কোহিনুর বেগমের দাবি, ডাকাতদের কারও হাতে ছুরি, আবার কারও হাতে পিস্তল ছিল। তাদের কাউকে চিনতে না পারলেও ডাকাতদের কারও কারও গলার স্বর স্থানীয় লোকজনের মতো মনে হয়েছে।
ঘটনার পর জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের একাধিক দল অভিযান শুরু করেছে।
জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল হালিম বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। দ্রুত ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে এবং জড়িতদের আটক করা সম্ভব হবে।’
এর আগে শনিবার (৮ আগস্ট) রাত ২টার দিকে মিরসরাইয়ের ১২ নম্বর খৈয়াছড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হাজি শফি আহমেদ মেস্ত্রী বাড়িতে একটি বসতঘরে ডাকাতির অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্র জানায়, গভীর রাতে সংঘবদ্ধ একটি ডাকাতদল ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরিবারের সদস্যদের হাত-পা ও মুখ বেঁধে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ঘরের বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালানো হয়।
এ সময় স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নেওয়ার অভিযোগ করেন পরিবারের সদস্যরা।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বসতবাড়ির পর এবার ডাকাতদের হানা পড়ে শিল্পাঞ্চলেও। ৯ আগস্ট দিবাগত রাত ২টার দিকে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্মাণাধীন কারখানায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল কারখানায় হানা দিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের তিনটি মোবাইল ফোন, প্রায় ২৫০ মিটার বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষ জোরারগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করে। মামলার পর অর্থনৈতিক অঞ্চল এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ।
গ্রেপ্তাররা হলেন-হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলীর মেহেদী হাসান (৩২), মেহেদীনগরের সুজাউল হক প্রকাশ সুজা উল্লাহ (২৪), এমদাদুল হক প্রকাশ এমরান (২৮), পূর্ব হিঙ্গুলীর মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রকাশ নাহিদ (২৪), মেহেদীনগরের মো. ইউসুফ (২৬), জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের খিলমুরারীর মো. রাকিব (২১) এবং করেরহাট ইউনিয়নের মিজান উদ্দিন (৩২)।
জোরারগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল হালিম জানান, ৩২ ঘণ্টার অভিযানে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছেন। অন্যদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে উপজেলার ১০ নম্বর মিঠানালা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের শেখ রুহুল আমিন বাড়িতেও বুধবার দিবাগত রাতে একটি বসতঘরে চুরির ঘটনা ঘটে।
পরিবারের সদস্যরা শহরে অবস্থান করায় ঘরটি ফাঁকা থাকার সুযোগে চোরেরা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে ঘরের মালামাল তছনছ করা হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়েছে।
তবে মিরসরাই থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে বৈদ্যুতিক তার চুরির আলামত পাওয়া গেছে। স্বর্ণালংকার চুরির বিষয়টি পুলিশ নিশ্চিত নয়। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিরসরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ডাকাতি ও চুরির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ঘটনার পর অভিযান নয়, ডাকাতি-চুরি প্রতিরোধে আগাম নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানও জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল ও বিভিন্ন বাজারে রাতের টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের প্রত্যাশা, ধারাবাহিক এসব ঘটনায় জড়িত সংঘবদ্ধ চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মিরসরাইয়ের রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
