থানার এক কোণে হাতকড়া পরা এক তরুণ। সামনে মোবাইল ক্যামেরা ধরে এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলছেন, শেখাচ্ছেন চুরির আদ্যোপান্ত। অন্য এক ভিডিওতে সাহায্য চাইতে আসা এক নারীর অসহায়ত্বকে মূলধন করে চলছে ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা।
আইনি সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য এখন অপেশাদার ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ হয়ে উঠেছেন।
পেশাগত পোশাক ও সরকারি পরিচয়কে পুঁজি করে ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ, ইউটিউব, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হচ্ছে এসব ভিডিও।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের এমন অন্তত ১০৭টি ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টের নাম, যার অনুসারী সংখ্যা লাখ থেকে ১৬ লাখ পর্যন্ত।
অথচ জনবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থার নামে শুরু হওয়া এই সংস্কৃতি এখন নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘন, অপরাধের ডিজিটাল প্রশিক্ষণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপরাধ দমনের অন্তরালে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও গোপনীয়তার অবক্ষয়
সহায়তা কিংবা আইনি সুরক্ষার আশায় সাধারণ মানুষ যখন পুলিশের শরণাপন্ন হন, তখন তাঁদের উপস্থিতি বা স্বীকারোক্তি ক্যামেরাবন্দী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সংবিধানস্বীকৃত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার চরম লঙ্ঘন।
আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযানের সময় ভিডিও ধারণ কেবল তদন্তের স্বার্থেই ব্যবহারযোগ্য, কোনো অবস্থাতেই তা জনসম্মুখে প্রচারের উপাদান হতে পারে না।
আদালতের বিচারাধীন কোনো বিষয়ে রায় আসার আগেই কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে জনসম্মুখে ভিডিও প্রকাশ করা একটি প্রত্যক্ষ ‘মিডিয়া ট্রায়াল’।
এতে অভিযুক্তের পুনর্বাসন ও মর্যাদার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়। এ ছাড়া অনেক ভিডিওতে সাহায্য বা মানবিক কর্মকাণ্ডের যে ছবি তুলে ধরা হয়, অনুসন্ধানে দেখা গেছে তার মূল চালিকাশক্তি সেবা নয়, বরং পেজের মনিটাইজেশন থেকে আসা ব্যক্তিগত আর্থিক মুনাফা এবং সস্তা জনপ্রিয়তা।
ভিডিওতে অপরাধের ‘প্রশিক্ষণ’: নিজস্ব কন্টেন্টেই থমকে যাচ্ছে তদন্ত
পুলিশের তৈরি সচেতনতামূলক বা অভিযানের নাটকীয় ভিডিওগুলো প্রকৃতপক্ষে অপরাধীদের জন্য গোপন প্রশিক্ষণের পাঠশালায় পরিণত হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ভিউয়ের আশায় চুরির কৌশল, অপরাধী শনাক্তের পদ্ধতি কিংবা পুলিশের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা যখন বিস্তারিত দেখিয়ে দেওয়া হয়, তখন অপরাধীরা আরও কৌশলী হয়ে উঠছে।সূত্র সারাক্ষণ
প্রযুক্তির ছদ্মবেশ: ভিডিও দেখে আসামিরা জেনে যাচ্ছে পুলিশের অনুসন্ধানী নজরের পরিধি। ফলে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়ানো, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট না রাখা এবং বার বারবার ডিভাইস বদলানোর মতো কৌশল রপ্ত করছে তারা।
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা: প্রচলিত ভুলের পরিবর্তে অপরাধীরা এখন অত্যন্ত সতর্ক পথ অবলম্বন করায় সামান্য অপরাধের ক্লু উদ্ঘাটন করতেও পুলিশকে দীর্ঘ হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে পুলিশের নিজেদের তৈরি ভিডিওই বাস্তবে তাঁদের নিজস্ব তদন্তপ্রক্রিয়াকে স্থবির করে দিচ্ছে।
ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় মূলধারার গণমাধ্যমকেও হার মানানো পেজসমূহ
পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের পরিচয়ে পরিচালিত প্রধান কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্ট:
| ক্রম | পেজ / অ্যাকাউন্টের নাম | অনুসারী সংখ্যা |
| ১ | শহীদুল ইসলাম (এএসআই) | ১৬ লাখ |
| ২ | শামীম হাসান | ১৬ লাখ |
| ৩ | সুজন শ্রাবণ | ১৩ লাখ |
| ৪ | নাইমুর বিপি ০৩ | ১০ লাখ |
| ৫ | সার্জেন্ট আনিসুর রহমান (আনিসুর রহমান) | ১০ লাখ |
| ৬ | এশা রহমান | ১০ লাখ |
| ৭ | অলক দের (অলক কুমার দে পিপিএম) | ৮ লাখ ২২ হাজার |
| ৮ | মুখলেচুর রহমান | ৭ লাখ ৪৯ হাজার |
| ৯ | আজাদ বিপি | ৬ লাখ ৪৭ হাজার |
| ১০ | এমডি মশিউর রহমান (মশিউর ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রাভেল) | ৫ লাখ ৯৫ হাজার |
| ১১ | শিমুল ভাই | ৫ লাখ ২৬ হাজার |
| ১২ | মাসুদ আলম ফ্যান | ৪ লাখ ৬৬ হাজার |
| ১৩ | সঞ্জয় গোস্বামী (নিলয় হাবি) | ৩ লাখ ৯২ হাজার |
সূত্র: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুসন্ধান
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি ও পোশাকের অপব্যবহার
দিনাজপুরের কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসি নুর নবীর নামে পরিচালিত পেজে হাতকড়া পরা তরুণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তিনি ‘ফ্যান পেজ’ দাবি করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে, শেরপুরের নালিতাবাড়ী থানার এএসআই শহীদুল ইসলাম ডিউটির সময় ইউনিফর্ম পরে ভিডিও বানানোর কথা অকপটে স্বীকার করে একে সামাজিক কাজ বলে দাবি করেন।
তবে আইনি কাঠামোর দৃষ্টিতে এই যুক্তি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ পুলিশের ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা’ অনুযায়ী, পোশাক পরিহিত অবস্থায় বা দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের জন্য কন্টেন্ট তৈরি বা লাইভ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও সরাসরি ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য।
পুলিশ সদর দপ্তরের বার্তা ও জরুরি বিভাগীয় পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, সরকারি পোশাক ও পদের অপব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রচার সরকারি শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল।
পূর্বের কয়েকটি ঘটনায় বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও বর্তমানে চিহ্নিত এই ১০৭টি পেজ ও অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক তদন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
জননিরাপত্তা ও একটি বাহিনীর পেশাদারত্ব রক্ষায় অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের আর্থিক মনিটাইজেশন সুবিধা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি।
অন্যথায় ব্যক্তিস্বার্থ আর সস্তা জনপ্রিয়তার কাছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মৌলিক গুরুত্ব বিলীন হতে বাধ্য।
