back to top

চট্টগ্রামের কর কমিশনারদের দখলে সরকারি অফিস ভবন: কার্যালয়ের আড়ালে বিলাসবহুল আবাসন ও দ্বৈত ভাতার সুবিধা

প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৬ ০৯:৩৮

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরী ও প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি তহবিল আত্মসাতের এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে সরকারের আয়কর বিভাগের কার্যালয় হিসেবে বরাদ্দকৃত একটি বহুতল ভবনের একাধিক বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটকে বছরের পর বছর ধরে নিজেদের ব্যক্তিগত বিলাসবহুল আবাসন হিসেবে ব্যবহার করছেন একাধিক কর কমিশনার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে চলে আসা এই বেআইনি প্রথার মাধ্যমে শুধু যে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার করা হচ্ছে তা-ই নয়; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একই সাথে নিজেদের সরকারি বেতন থেকে ‘বাড়িভাড়া ভাতাও’ (Housing Allowance) নিয়মিত উত্তোলন করছেন। কর কর্মকর্তাদের এমন দ্বৈত সুবিধার কারণে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের সম্ভাব্য রাজস্ব ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের চিত্র: অফিস যখন কর কর্তাদের বাসস্থান

সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার সিডিএ ২ নম্বর সড়কে অবস্থিত ১৪ তলা ‘পিএইচপি ভবনটি’ আয়কর বিভাগের বিভিন্ন সার্কেল (কর অঞ্চল ১, ২, ৩ এবং ৪) অফিসের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়। কিন্তু বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ভবনের অন্তত ৬টি বড় আকারের ফ্ল্যাটকে (প্রতিটি প্রায় ১,৭০০ বর্গফুট) আবাসিক কোয়ার্টারে রূপান্তর করা হয়েছে।

দখলদারিত্বের তালিকায় থাকা শীর্ষ কর্মকর্তাদের বর্তমান চিত্র নিম্নরূপ:

কর্মকর্তার নাম ও পদবিসংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলভবনের অবস্থান ও ফ্ল্যাট সংখ্যাবর্তমান স্থিতি ও অভিযোগ

মঞ্জুর আলম

 

(কর কমিশনার)

কর অঞ্চল-১১২ তলা (১টি ফ্ল্যাট)ব্যক্তিগত আবাসন হিসেবে ব্যবহার করছেন।

মিজানুর রহমান

 

(অতিরিক্ত কর কমিশনার)

কর অঞ্চল-১১২ তলা (১টি ফ্ল্যাট)ব্যক্তিগত আবাসন হিসেবে ব্যবহার করছেন।

সাধন কুমার রায়

 

(কর কমিশনার)

কর অঞ্চল-২৭ম তলা (২টি ফ্ল্যাট)দুটি ফ্ল্যাট একক নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবহার করছেন।

শাহীন আক্তার হোসেন

 

(কর কমিশনার)

কর অঞ্চল-৩১০ম তলা (২টি ফ্ল্যাট)দুটি ফ্ল্যাট একক নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগ।

নিয়মের ব্যতিক্রম: প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধাচারের দৃষ্টান্ত

অফিস ভবনকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের এই দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির বিপরীতে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কর অঞ্চল ৪-এর নবনিযুক্ত কমিশনার ফরিদ আহমেদ।

চলতি বছরের (২০২৬) মার্চ মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর, তিনি আগ্রাবাদের ১ নম্বর সড়কের ‘রহিম ম্যানশনে’ কমিশনারের জন্য অনৈতিকভাবে সংরক্ষিত একটি আবাসন ব্যবস্থা গত এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেন। তিনি সেই আবাসিক স্থানটিকে পুনরায় সরকারের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে প্রশাসনের ভেতর সংস্কারের নজির গড়েছেন।


“এটি একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা”: অভিযুক্তদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থন

এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে কর অঞ্চল ১-এর কমিশনার মঞ্জুর আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করেন, তবে এটিকে একটি স্বাভাবিক ‘প্রথা’ হিসেবে দাবি করেন। তিনি বলেন:

“এগুলো তো অনেক আগে থেকেই এভাবে চলে আসছে, সম্ভবত ২০১১ সাল থেকে। সকল কমিশনারের কাছেই এটা একটা প্রথার মতো হয়ে গেছে। এটা শুধু আমার একার ক্ষেত্রে ঘটেছে, বিষয়টি এমন নয়।”

অন্যদিকে, কর অঞ্চল ৩-এর কমিশনার শাহীন আক্তার হোসেন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এ ধরনের কোনো ফ্ল্যাট আমার দখলে নেই।” তবে কর অঞ্চল ২-এর কমিশনার সাধন কুমার রায়ের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে মন্তব্য বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) সদস্য (প্রশাসন) আহসান হাবিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।


আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আইনি ও সুশাসন বিতর্ক

আন্তর্জাতিক সুশাসন বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, একজন কর নির্ধারক বা শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা যখন একই সাথে বিনামূল্যে সরকারি আবাসন ভোগ করেন এবং নিজের মূল বেতন থেকে বাড়িভাড়া ভাতা উত্তোলন করেন, তখন তা সরাসরি ‘আর্থিক জালিয়াতি’ (Financial Fraud) এবং ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ (Conflict of Interest) আইনের আওতায় পড়ে। এটি কেবল সুশাসনের পরিপন্থীই নয়, বরং সাধারণ করদাতাদের অর্থের চরম অবমাননা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ স্তরে বছরের পর বছর ধরে চলা এই অনৈতিক সংস্কৃতি বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অডিট বিভাগের নজরদারির দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা আদায়কারী সংস্থাই যখন এভাবে কর ফাঁকি ও অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার গ্যাঁড়াকলে লিপ্ত, তখন তা পুরো কর ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ করে।