back to top

পরীক্ষার দিন থানায় কাটল ছেলের, কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা!

মানবিক সুযোগ না পাওয়ায় পরীক্ষা মিস,আলোচনায় বাকলিয়ার ওসি

প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬ ১৩:৩৩

যে বয়সে একজন কিশোরের হাতে থাকার কথা কলম, খাতা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সেই বয়সেই চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার একটি কক্ষে বসে কাটাতে হয়েছে মো. এইদুল আলমের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার দিন।

বুধবার ছিল তার এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা। সহপাঠীরা যখন পরীক্ষার খাতায় নিজেদের ভবিষ্যৎ লিখতে ব্যস্ত, তখন সিএন্ডবি কলোনি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এই এসএসসি পরীক্ষার্থী বসে ছিল থানার হেফাজতে। পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি তার।

পরিবারের দাবি, সুযোগ ছিল। প্রয়োজন ছিল শুধু একটি মানবিক সিদ্ধান্তের।

জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় মঙ্গলবার (৯ জুন) এইদুলসহ কয়েকজনকে বাকলিয়া থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়।

কিন্তু পরিবারের ভাষ্য, বুধবার তার ব্যবহারিক পরীক্ষা থাকলেও পুলিশ পাহারায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ চেয়ে বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল। সেই অনুরোধ গ্রহণ করা হয়নি।

সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ছিল একজন মায়ের আর্তি!
এইদুলের মা ববি আক্তার জানান, তিনি একাধিকবার বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমানের কাছে গিয়েছেন।

ছেলের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে আইনি প্রক্রিয়া চলুক, তাতে তার আপত্তি ছিল না। কিন্তু অন্তত পরীক্ষাটি দিতে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন তিনি।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেছিলেন, “দরকার হলে আমার ছেলেকে ১০ বছরের জন্য জেলে পাঠান, কিন্তু পরীক্ষাটা দিতে দেন।”

একজন মায়ের এই আবেদনও শেষ পর্যন্ত কোনো ফল আনতে পারেনি।

পরিবারের অভিযোগ, বুধবার ব্যবহারিক পরীক্ষার দিন পার হয়ে গেলেও বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত এইদুলকে আদালতে তোলা হয়নি। পুরো সময়ই সে থানায় ছিল। ফলে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগও হারিয়ে যায়।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে কি কোনো মানবিক ব্যবস্থা নেওয়া যেত না?

বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান অবশ্য ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “ওর যদি পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছে থাকত, তাহলে সে মারামারি করতে গেল কেন?”

ওসির এই মন্তব্য সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, কোনো অভিযোগ বা মামলার বিচার হওয়ার আগেই কি একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে?

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, মানবিক বিবেচনায় একজন পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

প্রয়োজন হলে পুলিশ পাহারায় হলেও তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে নেওয়া যেত।

তাদের ভাষায়, এটি এমন কোনো জটিল বিষয় ছিল না যার সমাধান অসম্ভব। বরং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বিবেচনায় বিষয়টি সমাধানযোগ্য ছিল।

তবে এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি আশার আলো। শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ থাকলে এইদুল আলমকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হতে পারে।

এখন অপেক্ষা-একটি সিদ্ধান্তের:
ব্যবহারিক পরীক্ষা শুধু কয়েক নম্বরের বিষয় নয়, অনেক সময় সেটি একটি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

আর তাই বাকলিয়ার এই ঘটনা মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে ঘিরে সমাজের কাছে রেখে যাওয়া একটি কঠিন প্রশ্ন।