বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) বহুল আলোচিত নির্বাচন আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করতেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঋণখেলাপির অভিযোগে প্রার্থিতা হারানো রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন চৌধুরী।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানো একটি বার্তা ঘিরে সংগঠনটির ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচন বোর্ড সূত্র বলছে, গত বুধবার বোর্ড চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী আগামী ১৩ জুন চট্টগ্রাম নগরের রেডিসন ব্লুতে ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করেন। এর কিছুক্ষণ পরই চেয়ারম্যানের কাছে একটি বার্তা পাঠান আমজাদ চৌধুরী।
বার্তায় লেখা হয়, ‘আসসালামু আলাইকুম। যাদের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন শিডিউল দিয়েছেন, তাদের থেকে খরচের টাকা বেশি করে নিয়ে নিয়েন।
কারণ আপনাকে নির্বাচনের পরে কোর্টে যাতায়াত করতে হবে; তখন তারা আপনার পাশে থাকবে না। কথাটা জানাইলাম। সাব জুডিশ মেটার রেখে নির্বাচন করতেছেন এইটার মাশুল আপনাকে আইনের মাধ্যমে দিতে হবে। কথাটা মনে করাই দিয়ে রাখলাম।’
নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী বার্তা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও এ নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি। তবে তিনি বলেন, আপিল বিভাগের নির্দেশনার আলোকে নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, গত ৮ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে।
একই সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পথও উন্মুক্ত হয়। সেই রায়ের ভিত্তিতেই ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে আমজাদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি কাউকে হুমকি দেননি। তাঁর দাবি, হাইকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নির্বাচন আয়োজন করায় চেয়ারম্যানকে আদালতে যেতে হতে পারে—শুধু সেই বিষয়টিই তিনি উল্লেখ করেছেন।
তবে পুরো ঘটনাপ্রবাহে প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসছে একই নাম?
ঘটনার সূত্রপাত গত ৩০ এপ্রিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদনে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হিসেবে উল্লেখ থাকায় নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে।
পরে তিনি আপিল বোর্ডে আবেদন করেন। কিন্তু ৬ মে অনুষ্ঠিত শুনানিতে আপিলও খারিজ হয়ে যায় এবং তাঁর মনোনয়ন বাতিল বহাল থাকে।
এরপর তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। গত ১ জুন করা রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট তাঁর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন। কিন্তু সেই আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন বোর্ড লিভ টু আপিল করলে পরিস্থিতি আবার বদলে যায়।
প্রথমে আংশিক শুনানিতে এবং পরে ৮ জুন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি শেষে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করা হয়। ফলে নির্বাচন বোর্ডের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে এবং আমজাদ চৌধুরী নির্বাচনের বাইরে চলে যান।
এদিকে সংগঠনের অভ্যন্তরে অনেকেই মনে করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের বিরোধ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের ধারাবাহিকতা।
গত বছরের ২৫ অক্টোবর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। তখন ১১টি পদের বিপরীতে ১১ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন।
কিন্তু নির্বাচন বোর্ড অভিযোগ করে, আমজাদ চৌধুরীর ‘অযাচিত হস্তক্ষেপে’ তারা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এর জেরে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পুরো নির্বাচন বোর্ড একযোগে পদত্যাগ করে।
পরবর্তীতে গত বছরের ৩ নভেম্বর সংগঠনের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে সভাপতির পদ ‘দখলের’ অভিযোগও ওঠে আমজাদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
বিষয়টি নিয়ে বিরোধ তীব্র হলে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে অপসারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এরপর বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সচিব আবু সাফায়াৎ মুহাম্মদ শাহে দুল ইসলামকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বর্তমান নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৮৬ জন। মোট ১৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দুই বছর মেয়াদের জন্য সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, দুই সহসভাপতি এবং সাতজন নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হবেন।
সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ছিল দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন এবং রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ চৌধুরীর। তবে আদালতের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের পর আমজাদ চৌধুরী আর নির্বাচনী দৌড়ে নেই।
এখন প্রশ্ন একটাই—দীর্ঘ আইনি লড়াই, প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, নির্বাচন বোর্ডের পদত্যাগ এবং চেয়ারম্যানকে পাঠানো বিতর্কিত বার্তার পর অবশেষে কি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন, নাকি ভোটের আগমুহূর্তে সামনে আসবে নতুন কোনো অধ্যায়?

