শেষ বাঁশি বাজতেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না লিওনেল মেসি। আটলান্টা স্টেডিয়ামের মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি। মুহূর্তেই ছুটে আসেন সতীর্থরা।
কেউ জড়িয়ে ধরলেন, কেউ কাঁধে তুলে নিলেন অধিনায়ককে। বিশ্বকাপে মিসরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে স্মরণীয় জয় পাওয়ার পর আনন্দ, স্বস্তি আর আবেগ যেন একসঙ্গে ধরা দিল আর্জেন্টাইন মহাতারকার চোখে।
কিন্তু কয়েক মিনিট আগেও দৃশ্যটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
গ্যালারিজুড়ে উদ্বেগ, মাঠে হতাশা, আর জায়ান্ট স্ক্রিনে বারবার ভেসে উঠছিল বিষণ্ন মুখের মেসি।
তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল-তবে কি বিশ্বকাপে তার গল্পের শেষ অধ্যায়টা এভাবেই লেখা হতে যাচ্ছে?
সেই শঙ্কাকে বাস্তবে রূপ নিতে দেয়নি লিওনেল স্কালোনির দল। মাত্র ১৪ মিনিটে তিন গোল করে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে আর্জেন্টিনা। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, যথারীতি, লিওনেল মেসি।
৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা আগের মতো পুরো ম্যাচজুড়ে দৌড়ে বেড়ান না। অনেক সময় হাঁটতে হাঁটতেই খেলেন।
কিন্তু ঠিক কখন আক্রমণের গতি বাড়াতে হবে, কখন প্রতিপক্ষের রক্ষণে আঘাত হানতে হবে, কিংবা কোন মুহূর্তে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে হবে-সেই অসাধারণ বোধ আজও তাকে আলাদা করে রাখে। বয়স হয়তো তার গতি কমিয়েছে, কিন্তু ফুটবল-প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি আর সৃজনশীলতায় এখনো তিনি অনন্য।
তবে শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না মেসির জন্য। প্রথমার্ধে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি তিনি। মিসরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবেইর দুর্দান্ত দক্ষতায় তার শট ফিরিয়ে দেন।
বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির চতুর্থ পেনাল্টি মিস এবং চলতি বিশ্বকাপে দ্বিতীয়।
কিন্তু বড় খেলোয়াড়দের পরিচয় মেলে সবচেয়ে কঠিন সময়েই। ম্যাচের শেষ ভাগে প্রথমে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে গোল করে ব্যবধান কমান ক্রিস্তিয়ান রোমেরো।
কয়েক মিনিট পর বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে নিজেই সমতা ফেরান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। আর নাটকীয় সেই প্রত্যাবর্তনের পূর্ণতা এনে দেন এনজো ফার্নান্দেজ।
ম্যাচ যত কঠিনই হোক, মেসি মাঠে থাকলে আশা ফুরিয়ে যায় না-এটাই যেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি।
এই ম্যাচে গোল করে মেসি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা ছয় ম্যাচে গোল করা প্রথম ফুটবলার হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। চলতি বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যাও পৌঁছেছে আটে।
ম্যাচ শেষ হলেও উদ্যাপন থামেনি। দীর্ঘ সময় গ্যালারিতে থেকে জয় উদ্যাপন করেছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। আর মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছছিলেন লিওনেল মেসি।
চার দশকের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই কিংবদন্তি যেন আবারও মনে করিয়ে দিলেন-ফুটবল তার কাছে কেবল একটি খেলা নয়। এটি তার আবেগ, দায়িত্ব, নেতৃত্ব এবং ইতিহাস রচনার আরেক নাম।

