ব্যবসায়িক লেনদেনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার দুই দিন পর জোরারগঞ্জের মহামায়া লেকের ভেতরে বন বিভাগের একটি পরিত্যক্ত কটেজ থেকে ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করেছে পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ।
এ ঘটনায় টানা অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দিনভর অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছেন মামলার এজাহারনামীয় আসামি মো. আবুল হাশেম (৫২)। এছাড়া তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় আকরাম (৩৪), শান্ত মিয়া (৩২), মঈন উদ্দিন রায়হান (২৯), আমজাদ হোসেন (৩৫), মাহবুব রহমান (২৬), মানিক হোসেন (৩০) ও মো. ফারুক (৩৪)কে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীর নাম মো. হেলাল উদ্দিন (৩৬)। তিনি হাটহাজারী এলাকার বাসিন্দা। পাঁচলাইশ থানার শুলকবহর রওশন বোর্ডিং সংলগ্ন এলাকায় একটি গাড়ির গ্যারেজ পরিচালনা করেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আবুল হাশেম ছিলেন হেলাল উদ্দিনের পূর্বপরিচিত ও ব্যবসায়িক অংশীদার। ব্যবসায় তিনি ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এর মধ্যে হেলাল উদ্দিন বিভিন্ন সময়ে ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। বাকি ৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
অভিযোগ রয়েছে, পাওনা টাকা আদায়ের জন্য আবুল হাশেম বেশ কিছুদিন ধরে হেলালকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন।
এজাহারে বলা হয়, এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে আবুল হাশেমসহ কয়েকজন শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের সামনে যান।
সেখানে ভয়ভীতি দেখিয়ে হেলাল উদ্দিনকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পরদিন, ৮ সেপ্টেম্বর সকালে, হেলালের মোবাইল নম্বর থেকে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারের মোবাইলে ফোন আসে। ফোনে অপহরণকারীরা ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিপণের টাকা না দিলে হেলালকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করে এক লাখ টাকা পাঠাতে বলা হয়।
ঘটনার পর জেসমিন আক্তারের করা মামলার তদন্তে নামে পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আকবরশাহ থানার উত্তর কাট্টলী এলাকা থেকে শান্ত মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচলাইশের মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আবুল হাশেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আবুল হাশেমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আকবরশাহ থানার লতিফপুর এলাকা থেকে আকরামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আকরামের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয় হেলাল উদ্দিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার শান্ত মিয়া ও আকরামকে জিজ্ঞাসাবাদে হেলাল উদ্দিনকে জোরারগঞ্জের মহামায়া লেক এলাকায় রাখা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়।
এরপর মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের সহায়তায় মহামায়া লেকের ভেতরে বন বিভাগের একটি পরিত্যক্ত কটেজে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে সেখান থেকে মঈন উদ্দিন রায়হান, আমজাদ হোসেন, মাহবুব রহমান, মানিক হোসেন ও ফারুককে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে ওই কটেজ থেকে অপহরণের অভিযোগে নিখোঁজ থাকা হেলাল উদ্দিনকে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ আরও জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা ব্যবসায়িক পাওনা টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে হেলালকে অপহরণের কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, আবুল হাশেম ও আকরাম মিলে শান্ত মিয়াকে এক লাখ টাকা দিয়ে অন্যদের ভাড়া করে অপহরণের ঘটনায় সম্পৃক্ত করেন।
তবে এসব তথ্য প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া বলে জানিয়েছে পুলিশ, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় ৮ সেপ্টেম্বর পাঁচলাইশ মডেল থানায় দণ্ডবিধির ৩৬৫, ৩৮৫, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় মামলা করা হয়েছে।
মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটজনকে গ্রেপ্তার এবং ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের দাবি, ব্যবসায়িক পাওনা টাকা আদায়ের বিরোধকে কেন্দ্র করে হেলাল উদ্দিনকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় গ্রেপ্তারদের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য তথ্য-উপাত্তও তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।
