ধর্ম, ন্যায়, মানবতা ও কল্যাণের চিরন্তন বাণী নিয়ে আজ পালিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ জন্মাষ্টমী।
ভক্তি, প্রার্থনা, উপবাস, পূজা-অর্চনা ও হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা স্মরণ করছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র আবির্ভাবতিথি।
হিন্দুধর্মানুসারে, পৃথিবী থেকে দুরাচারী ও দুষ্টদের দমন এবং সজ্জনদের রক্ষার জন্যই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই দিনে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
দ্বাপর যুগের শেষ দিকে এই মহাপুণ্য তিথিতে মথুরা নগরের অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।
তাঁর এই পবিত্র আবির্ভাবতিথিই ভক্তদের কাছে শুভ জন্মাষ্টমী হিসেবে সমাদৃত ও উদ্যাপিত হয়ে আসছে।
জন্মাষ্টমী শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, ভক্তদের কাছে এটি সত্য, ন্যায়, মানবতা ও কল্যাণের পথে ফিরে আসার এক পবিত্র আহ্বান।
শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনের মধ্য দিয়ে অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করার অনুপ্রেরণা খুঁজে পান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
চট্টগ্রামসহ সারা দেশের বিভিন্ন মন্দিরে আজ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে পূজা-অর্চনা, হরিনাম সংকীর্তন ও নামযজ্ঞের। মন্দিরের পাশাপাশি ঘরে ঘরেও ভক্তরা উপবাস থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করবেন।
প্রার্থনা করবেন দেশ, জাতি ও সমগ্র বিশ্বের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হিন্দুধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন।
দেশের হিন্দুধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বাণীতে বলেন, শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন পরোপকারী, দক্ষ রাজনীতিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন সত্য, ন্যায়, মানবতা ও কল্যাণের প্রতীক হয়ে।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিশ্বের নানা প্রান্তে ধর্মীয় কারণে মানুষে মানুষে সংঘাত, হানাহানি ও বিভেদ বাড়ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় সবাইকে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। শ্রীকৃষ্ণের দর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক ও ঐক্যবদ্ধ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
সারা বিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণীতে বলেন, শ্রীকৃষ্ণের বার্তা ও শিক্ষা সমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।
কেউ যেন সম্প্রীতির পরিবেশ বিনষ্ট করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রত্যেককে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় মন্দির শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে তারা জানিয়েছে, জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি পালন করবে দুই দিনের অনুষ্ঠান।
আজ সকাল আটটায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় অনুষ্ঠিত হবে শ্রী শ্রী গীতাযজ্ঞ। গীতাযজ্ঞ পরিচালনা করবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ ও মিশন।
এরপর বেলা তিনটায় অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিল। পলাশীর মোড়ে বেলা তিনটায় এ মিছিলের উদ্বোধন হবে।
প্রতিবছরের মতো এবারও মিছিলটি পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হবে। রাতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অনুষ্ঠিত হবে শ্রীকৃষ্ণপূজা।
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে তিন দিনের কর্মসূচি নিয়েছে। আজ ইসকনের স্বামীবাগ মন্দিরে সকাল আটটায় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হবে তাদের কর্মসূচি।
এরপর ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হবে কীর্তন মেলা, শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের রহস্য নিয়ে আলোচনা ও আলোচনা সভা। সন্ধ্যায় থাকবে সন্ধ্যা আরতি ও শ্রীকৃষ্ণলীলামৃত। রাত নয়টায় অনুষ্ঠিত হবে মহাভিষেক।
ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনেও জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠান শুরু হবে আজ সকালে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে। পরে অনুষ্ঠিত হবে ভজন ও প্রসাদ বিতরণ।
সন্ধ্যায় হবে শ্রীকৃষ্ণপূজা ও শ্রীশ্যামনাম সংকীর্তন। এরপর অনুষ্ঠিত হবে শ্রীশ্রী মহামায়ার কাঠামো পূজা।
জন্মাষ্টমীর এই পবিত্র তিথিতে পূজা, প্রার্থনা, সংকীর্তন ও ধর্মীয় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত হবে শ্রীকৃষ্ণের নাম।
অশুভের বিনাশ, শুভের প্রতিষ্ঠা এবং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও সম্প্রীতির সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে পালিত হবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র জন্মতিথি।
