চট্টগ্রাম বন্দরে ‘ঘুষের দাপট’: একই শাখায় ৮ বছর, আরিফ মাহমুদকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫৮

ফাইল আটকে অর্থ দাবি, সরকারি কোয়ার্টার ভাড়া, মোটরসাইকেলের জ্বালানি-রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ভেন্ডর লাইসেন্সে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ—নথি ও হিসাব যাচাইয়ের দাবি

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিবহন বিভাগের শিপিং শাখায় কর্মরত উচ্চমান সহকারী মো. আরিফ মাহমুদকে ঘিরে ঘুষ দাবি, ফাইল আটকে রাখা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার অনিয়মিত ব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট ও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, অর্থ না দিলে বিভিন্ন আবেদন ও নথির ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। ফলে অনেকেই কাজ দ্রুত করাতে বাড়তি অর্থ দিতে বাধ্য হন।

শুধু ঘুষের অভিযোগই নয়, একই পদে একই শাখায় টানা প্রায় আট বছর দায়িত্ব পালন, সরকারি কোয়ার্টার অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ, বরাদ্দকৃত মোটরসাইকেলের জ্বালানি ও মেরামতের অর্থ উত্তোলন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি এবং তৎকালীন সিবিএ সাধারণ সম্পাদক নায়েবুল ইসলাম ফটিকের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তার ভাইয়ের নামে ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ভেন্ডর লাইসেন্স অনুমোদন করানোর অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগগুলোর কিছু বিষয়ে আরিফ মাহমুদ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট নথি, হিসাব, ভেন্ডর লাইসেন্স, কোয়ার্টার বরাদ্দ ও ব্যবহারসংক্রান্ত রেকর্ড এবং মোটরসাইকেলের জ্বালানি ও মেরামতের বিল স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

‘টাকা না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকে’

সংশ্লিষ্ট একাধিক শিপিং এজেন্টের অভিযোগ, বিভিন্ন আবেদন ও নথিপত্র প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে আরিফ মাহমুদ সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে অর্থ দাবি করেন। অর্থ দিতে রাজি না হলে ফাইল দীর্ঘদিন পড়ে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিপিং এজেন্টের কর্মকর্তা বলেন, “টাকা না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।”

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একজন কর্মচারীর হাতে ফাইলের গতি অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়লে স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এতে সেবাগ্রহীতাদের যেমন ভোগান্তি হয়, তেমনি সরকারি রাজস্ব-সংক্রান্ত কার্যক্রমেও বিলম্ব ও অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়।

‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’-এর প্রসঙ্গও। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মো. আরিফ মাহমুদ তৎকালীন চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একই সময়ে তৎকালীন সিবিএ সাধারণ সম্পাদক নায়েবুল ইসলাম ফটিকের আশীর্বাদে তার ভাইয়ের নামে ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ভেন্ডর লাইসেন্স অনুমোদন করানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ভেন্ডরের মাধ্যমে কাজ করা শিপিং এজেন্টদের ফাইল তুলনামূলক দ্রুত নিষ্পত্তি করা হতো। বিপরীতে যারা ওই ভেন্ডরের মাধ্যমে কাজ করতেন না, তাদের ফাইল দীর্ঘ সময় আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ভেন্ডর লাইসেন্সের আবেদন, মালিকানার কাগজপত্র, অনুমোদনের নথি, সংশ্লিষ্ট সময়ের ফাইল নিষ্পত্তির রেকর্ড এবং আরিফ মাহমুদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্কের নথি যাচাই করা জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আরিফ মাহমুদ বলেন, “এটি আমার না, আমার ভাইয়েরও না।”

তবে প্রতিবেদকের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স তার আপন ভাইয়ের নামে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি নথিই হতে পারে চূড়ান্ত প্রমাণ।

সরকারি কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাদ্দকৃত আগ্রাবাদের ডেবার পাড় এলাকার জে-১১৬/বি নম্বর সরকারি বাসা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বরাদ্দ পাওয়া বাসাটি অন্যের কাছে ভাড়া দিয়েছেন আরিফ মাহমুদ। অথচ সেখানে সরকারি বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহৃত হচ্ছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজে ছোটপুল এলাকায় একটি নিজস্ব ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।

বাসা ভাড়া দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফ মাহমুদ বলেন, “বন্দরে অনেকে বাসা ভাড়া দিয়েছে। শুধু কি আমারটা দেখলেন?”

তবে সরকারি কোয়ার্টারটি তিনি অন্যকে ভাড়া দিয়েছেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি ও স্পষ্ট জবাব তিনি দেননি।

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে কোয়ার্টার বরাদ্দের আদেশ, বসবাসকারীর তথ্য, বিদ্যুৎ-গ্যাসের ব্যবহার, ইউটিলিটি বিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন প্রতিবেদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

মোটরসাইকেল চলছে কি, নাকি চলছে শুধু বিল?

বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাদ্দকৃত মোটরসাইকেল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কয়েকজন সহকর্মীর দাবি, তারা আরিফ মাহমুদকে নিয়মিত মোটরসাইকেল চালাতে দেখেননি। অথচ জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ নিয়মিত অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে আরিফ মাহমুদ বলেন, “আমি নিজেই চালাই, তবে প্রায় সময়ই এটি নষ্ট থাকে।” পরে তিনি জানান, মোটরসাইকেলটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মোটরসাইকটির জ্বালানি ও মেরামত বাবদ নিয়মিত অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে।

এ অভিযোগ সত্য হলে সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই মোটরসাইকেলের লগবুক, জ্বালানি উত্তোলনের হিসাব, মেরামতের বিল, ওয়ার্কশপের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি অর্থ ছাড়ের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ঘুষ চাওয়ার কথোপকথনের অডিও

এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে অর্থ চাওয়ার বিষয়ে আরিফ মাহমুদের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।

অডিওটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে কিছু করতে পারলে করেন।” এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

লাইসেন্স নবায়নের সময় ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এটি আমার দপ্তরে রিনিউ হয় না।”

তবে কোনো অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সেটির উৎস, সম্পাদনা হয়েছে কি না, কথোপকথনে কারা ছিলেন এবং বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

একই শাখায় আট বছর—বদলি না হওয়ায় প্রশ্ন

২০১৮ সাল থেকে একই শাখায় একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আরিফ মাহমুদ। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকার কারণে তার প্রশাসনিক প্রভাব ও সংশ্লিষ্টদের ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি হলেও আরিফ মাহমুদ একই শাখায় বহাল রয়েছেন। সম্প্রতি বন্দর কর্তৃপক্ষ পুরোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি সংক্রান্ত আদেশ জারি করলেও তাতে তার নাম না থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে আরিফ মাহমুদ বলেন, “আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করছি। বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাকে সরাচ্ছে না।”

তাহলে প্রশ্ন হলো—একই পদে একজন কর্মচারীকে দীর্ঘ সময় একই শাখায় রাখার প্রশাসনিক কারণ কী? এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের বদলি নীতি ও সংশ্লিষ্ট আদেশগুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সরকার বদলের পর ‘নতুন পরিচয়’?

অভিযোগকারীদের দাবি, ৫ আগস্টের পর আরিফ মাহমুদ নিজেকে বিএনপির নির্যাতিত নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। বর্তমানে সাধারণ কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে আরিফ মাহমুদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি যাচাই না করে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সুযোগ নেই।

প্রশাসনের জবাব কী?

মোটরসাইকেল সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি ট্রাফিক সেকশনের আওতাধীন।

এ বিষয়ে ট্রাফিক সেকশনের পরিচালকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে আসল চিত্র

মো. আরিফ মাহমুদ ঘুষ, সরকারি বাসা ভাড়া ও মোটরসাইকেল-সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ তার কিংবা তার ভাইয়ের নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।

তবে অভিযোগগুলোর ধরন ও পরিমাণ বিবেচনায় এগুলো শুধু মৌখিক অভিযোগ হিসেবে ফেলে রাখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে সরকারি কোয়ার্টার, মোটরসাইকেলের জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ভেন্ডর লাইসেন্স, ফাইল নিষ্পত্তির সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মধ্যে অসঙ্গতি আছে কি না—তা নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে যদি ঘুষ দাবি, ফাইল আটকে রাখা কিংবা সরকারি সম্পদ ও সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থ, রাজস্ব আদায় এবং সেবাগ্রহীতাদের অধিকারও জড়িত।

তাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত করা। প্রয়োজনে অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি ও হিসাব নিরীক্ষা করা যেতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।

এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কোনোটি প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। বরং সংশ্লিষ্ট নথি, হিসাব ও বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযোজন করা হবে।

অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।