চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন কর্মকর্তা, বদলি বাণিজ্যে কোটি টাকার দুর্নীতির ছায়া

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:৩০

চট্টগ্রামের উপকূলীয় বন বিভাগে বিশাল অংকের আর্থিক লেনদেন, অবৈধ বদলি বাণিজ্য এবং দুর্নীতির নতুন অভিযোগ ঘিরে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও উপ-বনসংরক্ষক এম এ হাসানের বিরুদ্ধে ছয় লাখ টাকার বদলি চুক্তির অংশ হিসেবে সরাসরি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে এসেছে। বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে এখন বন বিভাগে তোলপাড় চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জে বদলির প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট এক রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে ডিএফও এম এ হাসানের মোট ছয় লাখ টাকার এক গোপন চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম হিসেবে এক লাখ টাকা কুরিয়ার সার্ভিস ‘এসএ পরিবহন’-এর মাধ্যমে সরাসরি এম এ হাসানের কাছে পাঠানো হয়। পার্সেল বুকিংয়ের ওই রসিদে প্রাপক হিসেবে স্পষ্টভাবে ডিএফও এম এ হাসানের নাম, মোবাইল নম্বর এবং প্রেরিত অর্থ হিসেবে এক লাখ টাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কুরিয়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ রসিদটির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এমনকি অর্থ প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তাও কুরিয়ারে টাকা পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও লেনদেনের প্রকৃত কারণ জানাতে অস্বীকৃতি জানান।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বন বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক লেনদেনের আইনি জটিলতা ও প্রমাণ এড়াতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী, আত্মীয়-স্বজন ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঘুষের অর্থ লেনদেনের কৌশল ব্যবহার করে আসছেন এম এ হাসান। কেবল বদলি বাণিজ্যই নয়, বনায়ন ও বাগান সৃজন প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা আত্মসাতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজ পরিবার ও স্বজনদের নামে একাধিক ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর এবং একাধিক অভিজাত ফ্ল্যাট তৈরি করেছেন বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলছে।

অভিযোগের বিষয়ে ডিএফও এম এ হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে কুরিয়ারে টাকা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তবে হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট বুকিং রসিদ পাঠালে তিনি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। লেনদেনের বিষয়ে জবাবদিহি না করে তিনি বলেন, “কে দিয়েছে, তাকে সামনে আনেন। এই টাকা কেন নেওয়া হয়েছে, আপনাকে বলব না। আপনি যা ভাবার ভাবতে পারেন।” একপর্যায়ে সাংবাদিকের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ করে তিনি সংযোগ কেটে দেন।

অন্যদিকে, সুন্দরবনে কর্মরত থাকাকালীন সময় থেকেই বর্তমান চট্টগ্রাম অঞ্চলের বনসংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দের সঙ্গে এম এ হাসানের বিশেষ সখ্য ও ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। তবে মিহির কুমার দে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আশ্রয়-প্রশয়ের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানান, এম এ হাসান অতীতে তাঁর অধীনে কাজ করলেও তিনি তাঁর কোনো ‘ডান হাত’ বা বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ছিলেন না।

প্রশাসনিক নীতিমালা ও সরকারি চাকরির বিধিমালাকে তোয়াক্কা না করে এক ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে এমন দুর্নীতির মহোৎসব চলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল ও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দেশের বন সম্পদ রক্ষা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এই অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির বিষয়ে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে দুর্নীতিবাজ ডিএফও এম এ হাসানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, অবৈধ সম্পদের হিসাব গ্রহণ এবং যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর আহ্বান জানাচ্ছে।