back to top

কাগজে ঢুকল ট্যাংকলরি, বাস্তবে উধাও ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল

ভুয়া ডিপ, জাল সই, কাটাছেঁড়া-তদন্তে ব্যবস্থাপকই মূল হোতা

প্রকাশিত: ২৩ মে, ২০২৬ ০৭:৪০

পদ্মা অয়েল পিএলসির জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরেই গড়ে উঠেছিল সংঘবদ্ধ চোরচক্র। কাগজে-কলমে ট্যাংকলরি ডিপোতে ঢুকেছে, তেল খালাসও হয়েছে—এমন সব নথি নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছিল।

কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। বাস্তবে চারটি ট্যাংকলরির একটিও ঢোকেনি কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে।

অথচ হিসাবের খাতায় দেখানো হয়েছে ৭২ হাজার লিটারের বেশি জেট ফুয়েল গ্রহণ করা হয়েছে। পরে সেই তেল ‘পরিবহন ক্ষতি’ দেখিয়ে গরমিল আড়ালের চেষ্টা করা হয়।

গত ১১ মার্চ সংঘটিত এই চাঞ্চল্যকর জেট ফুয়েল চুরির ঘটনায় পদ্মা অয়েল পিএলসির অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ জালিয়াতি, রেকর্ড বিকৃতি ও যোগসাজশের চিত্র।

তদন্তে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে কর্মরত আরও আটজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনটি জাতীয় শীর্ষ একটি গণমাধ্যমের হাতে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনা থেকে ট্যাংকারে করে আনা জেট এ-১ তেল নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে ট্যাংকলরিতে করে পাঠানো হয় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে।

প্রতিদিন এই রুটে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল পরিবহন করা হয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, ১১ মার্চ সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের মধ্যে চারটি ট্যাংকলরি গোদনাইল ডিপো থেকে জেট এ-১ বোঝাই করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। গাড়িগুলো চারটি পৃথক কোম্পানির।

কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর গেট রেজিস্টারে পরে উল্লেখ করা হয়, সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিট থেকে ৭টা ২৭ মিনিটের মধ্যে গাড়িগুলো ডিপোতে প্রবেশ করেছে।

কিন্তু তদন্ত কমিটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখতে পায়, ওই সময় কোনো ট্যাংকলরিই ডিপোতে প্রবেশ করেনি।

এরপর জিজ্ঞাসাবাদে নিরাপত্তারক্ষী মানিক কুমার রায় ও সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. শওকত হোসেন স্বীকার করেন, ডিপো ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হকের নির্দেশে গাড়ি না ঢুকলেও নিবন্ধন বইয়ে প্রবেশ দেখানো হয়েছিল।

শুধু গেট রেজিস্টারেই নয়, জ্বালানি গ্রহণের নথিতেও করা হয় একই ধরনের জালিয়াতি। চুক্তিভিত্তিক জুনিয়র কর্মকর্তা ছমীর উদ্দিন জ্বালানির গভীরতা, তাপমাত্রা ও ঘনত্ব উল্লেখ করে এভিয়েশন ফুয়েল স্টক ট্রান্সফার অ্যাডভাইস নোট এবং রিলিজ সার্টিফিকেটে সই করেন। ডিপোর চেকার আকতার কামালও গাড়ি না ঢুকলেও ‘ডিপ’ নেওয়ার তথ্য দেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরো ঘটনাটি আড়াল করতে পরে ট্যাংকের মজুত হিসাবেও কারসাজি করা হয়। কাগজে দেখানো হয়েছিল, চারটি ট্যাংকলরি থেকে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ৭ নম্বর ট্যাংকে জেট এ-১ গ্রহণ করা হয়েছে। সেই হিসাবে ট্যাংকে মজুত থাকার কথা ছিল ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৭৩ লিটার জ্বালানি।

কিন্তু পরদিন ১২ মার্চের হিসাবেই দেখা যায়, একই ট্যাংকে রয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪৬ লিটার জেট এ-১। অর্থাৎ হিসাবের গরমিল দাঁড়ায় ৭৩ হাজার ৭২৭ লিটার।

এরপর ট্যাংক স্টক লেজার রেজিস্টার পরীক্ষা করে তদন্ত কমিটি আরও বিস্ময়কর তথ্য পায়। সেখানে কোনো পরিচালন কার্যক্রম ছাড়াই ৭৩ হাজার ৮৯৫ লিটার জ্বালানিকে ‘পরিবহন ক্ষতি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা ও ভুয়া পরিবহন ক্ষতির হিসাব দেখিয়ে তেল আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হককে পুরো ঘটনার “মূল পরিকল্পনাকারী ও নিয়ন্ত্রক” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির ভাষ্য, ট্যাংক স্টক লেজার নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি সহযোগীদের নিয়ে ৭২ হাজার ১৩২ লিটার জেট এ-১ আত্মসাতের অপচেষ্টা করেন।

এ ঘটনায় পদ্মা অয়েলের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চুক্তিভিত্তিক জুনিয়র কর্মকর্তা ছমীর উদ্দিন ও চেকার আকতার কামাল জালিয়াতির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।

অন্যদিকে সিকিউরিটি সুপারভাইজার শওকত হোসেন ও নিরাপত্তারক্ষী মানিক কুমার রায় ব্যবস্থাপকের নির্দেশ পালন করে অনিয়মে সহায়তা করেছেন।

ঘটনার পর সাইদুল হক, ছমীর উদ্দিন, আকতার কামাল, শওকত হোসেন ও মানিক কুমার রায়কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাইদুল হক। তাঁর দাবি, “অন্য কর্মকর্তারা এ কাজ করেছেন। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।”

অন্যদিকে ছমীর উদ্দিন তদন্ত কমিটি ও গণমাধ্যম—উভয়ের কাছেই দাবি করেছেন, চারটি ট্যাংকলরি ডিপোতে এসেছিল এবং তিনি তেল গ্রহণ করেছিলেন।

যদিও তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যকে “ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেছেন, এ ঘটনায় বিপিসির পক্ষ থেকেও পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, তদন্তে তেল গায়েব হওয়ার সত্যতা মিলেছে। এখন খতিয়ে দেখা হবে, গায়েব হওয়া তেল কোথায় গেছে এবং এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত।