বিশেষ প্রতিবেদক : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল হলো পুলিশ বাহিনী। কিন্তু চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহ সেই বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহফুজুর রহমান এবং তাঁর কয়েকজন অধীনস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক গুরুতর অভিযোগ কেবল একটি থানার প্রশাসনিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে না, বরং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে এক গভীর অতলে তলিয়ে দিচ্ছে।
অভিযোগের পাহাড় জমলেও দৃশ্যমান কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
আইনি ব্যত্যয়: গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ওসির ‘স্বেচ্ছাচারিতা’
চলতি জুন মাসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও আইনি বিতর্ক উস্কে দেওয়া ঘটনাটি ঘটে সিআর মামলা ১৪৬/২৩-কে কেন্দ্র করে। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক ১১ জুন চরনদ্বীপ এলাকার বাসিন্দা মো. মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় থানা থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনাটি বাংলাদেশের বিদ্যমান ফৌজদারি কার্যবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে:
ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৭৫ ধারা অনুযায়ী, আদালত কর্তৃক ইস্যুকৃত একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ততক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর থাকে, যতক্ষণ না সেটি ইস্যুকারী আদালত বাতিল করেন অথবা তামিল করা হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৮১ ধারা স্পষ্ট উল্লেখ করে, পরোয়ানা মূলে গ্রেপ্তারকৃত যেকোনো ব্যক্তিকে কোনো প্রকার বিলম্ব না করে (অনধিক ২৪ ঘণ্টা) অবশ্যই আদালতে হাজির করতে হবে।
আইনে স্পষ্ট বলা আছে, কোনো আসামিকে ওয়ারেন্টমূলে গ্রেপ্তারের পর থানা থেকে সরাসরি মুক্তি দেওয়ার কোনো আইনগত এখতিয়ার ওসির নেই। আসামি নির্দোষ হোক বা টেকনিক্যাল ত্রুটি থাকুক, তার ভাগ্য নির্ধারণের একচ্ছত্র অধিকার কেবল আদালতের।
ওসির দাবি—”ওয়ারেন্টের মূল কপি না পাওয়ায় যাচাই-বাছাই করে আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে”—আইনের চোখে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। প্রশ্ন ওঠে, যদি ওয়ারেন্ট কপি বৈধ নাই-ই হবে, তবে এসআই মৃন্ময় বাদীপক্ষের থেকে ২০ হাজার টাকা (অভিযোগ অনুযায়ী) গ্রহণ করে কেন এবং কিসের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করলেন? পুলিশের এই স্ববিরোধী বক্তব্য এবং কয়েক লক্ষাধিক টাকার বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগটি সরাসরি ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭’ এবং ‘দণ্ডবিধি, ১৮৬০’-এর ১৬১ ধারার (সরকারি কর্মচারী কর্তৃক অবৈধ পারিতোষিক গ্রহণ) লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য।
অপর একটি ঘটনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পুলিশের হামলা ও ক্ষমতার অপব্যবহার: সিসিটিভি ফুটেজে থলের বিড়াল
বোয়ালখালী থানার অরাজকতা কেবল ওসির কক্ষেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে মাঠপর্যায়ের উপ-পরিদর্শকদের (এসআই) মধ্যেও। গত ১২ জুন পৌরসভা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুল ইসলামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘খাজা এন্টারপ্রাইজ’-এ ঢুকে এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লা কর্তৃক প্রকাশ্য দিবালোকে দুই কর্মচারীকে মারধরের ঘটনাটি সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
একটি রাজনৈতিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে মাইকিং করার অজুহাতে সাধারণ কর্মচারীদের ওপর এই বর্বর হামলা বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের (আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের রক্ষণ) পরিপন্থী।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রকাশ্য অপরাধকে ওসি মাহফুজুর রহমান ‘ভুল বোঝাবুঝি’ আখ্যা দিয়ে ধামাচাপা দিয়েছেন। ওসির এই ‘ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি’ বা Culture of Impunity অপরাধী কর্মকর্তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে, যা পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (PRB) এবং সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালার সুস্পষ্ট পরিপন্থী।
অভিযােগ উঠেছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহফুজুর রহমান অতিতে ফেনীতে চাকুরী করা কালিন ফ্যাসিষ্ট শেখ হাসিনার অনুসারী হয়ে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও থানা হাজতে নির্যাতনের ফলে অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছে, চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য পাওয়া গেছে (ওসি) মো. মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে, ভুক্তভোগীরা জানান শীর্ঘ্রই মামলা করার প্রত্তুতি নিচ্ছে তার বিরুদ্ধে।
৫ আগস্টের চেতনা ও জনআস্থার চরম বিপর্যয়
গত বছরের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সাধারণ মানুষ একটি বৈষম্যহীন এবং দুর্নীতিমুক্ত আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার স্বপ্ন দেখেছিল। বোয়ালখালী থানায় সাময়িকভাবে সেই প্রতিফলন দেখা গেলেও, বর্তমান ওসির যোগদানের পর পরিস্থিতি দ্রুত উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।
চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সাথে পুলিশের সখ্যতা, জুলাই হত্যাকাণ্ডের অজ্ঞাতনামা মামলার ভয় দেখিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি এবং বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ আজ পুরো পুলিশ বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। যখন একটি রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেই আইন ভাঙার কারখানায় পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর থেকে আস্থা উঠে যায়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
জাতিসংঘের ‘আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের আচরণবিধি’ (Code of Conduct for Law Enforcement Officials) অনুযায়ী, পুলিশের প্রধান কাজ হলো মানবাধিকার রক্ষা করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। কিন্তু বোয়ালখালী থানার বর্তমান চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
স্থানীয় জনগণের মতে, অবিলম্বে এই থানা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো না হলে এবং ওসি মাহফুজুর রহমানসহ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় বা নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যেকোনো সময় গণ-অসন্তোষে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশ পুলিশের হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই এই ‘বোয়ালখালী সিন্ডিকেট’ ভাঙা এখন সময়ের দাবি।

