back to top

স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি 

প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬ ০০:২৩

বিশেষ প্রতিবেদক : 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন খাতে সংস্কারের হাওয়া লাগলেও, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) মালিকানাধীন এবং শিক্ষাবোর্ড অনুমোদিত ‘সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ’-এ চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে, ছাত্র আন্দোলনের ‘সমন্বয়ক’ ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাব খাটিয়ে একটি শিক্ষক সিন্ডিকেট ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং সাধারণ শিক্ষকদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে জিম্মি করে ফেলেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে পুঁজি করে গভর্নিং বডির দুই শিক্ষক প্রতিনিধি—জনাব মাসুদ রানাজনাব মো. নাসির উদ্দীন—প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেন। অভিযোগ রয়েছে, ‘সমন্বয়কদের’ প্রভাব দেখিয়ে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মিসেস সোহানা রহমানকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করেন তারা। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বা গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত ছাড়াই গায়ের জোরে এই পরিবর্তন করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্কুলের আর্থিক ও প্রশাসনিক খাত কুক্ষিগত করা।

নেপথ্যে

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মিসেস সোহানা রহমানকে বিদায় করার পর, উক্ত আসনে বসানো হয় জামায়াত-শিবির সমর্থিত জনাব আবু হেনা মোস্তফা কামালকে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুদ রানা ও নাসির উদ্দীনের যৌথ সিন্ডিকেট ব্যাকস্টেজে থেকে নিজেদের অনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। গত প্রায় দেড় বছর ধরে এই চক্রের বিরুদ্ধে একচ্ছত্র ‘ঘুষ বাণিজ্যের’ অভিযোগ উঠেছে:

  • অবৈধ ভর্তি বাণিজ্য: নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রচুর শিক্ষার্থীকে অবৈধভাবে ভর্তি করানো হয়েছে।

  • তহবিল তছরুপ: কোচিং ফি, পরীক্ষার খাতা বিক্রি এবং শিক্ষার্থীদের ডায়রি, আইডি কার্ড, কম্পিউটার সামগ্রী ও যাবতীয় স্টেশনারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে অতিরিক্ত ব্যয় (Over-invoicing) দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

১৭ শিক্ষকের ওপর প্রতিহিংসা: দুদককে ব্যবহারের ছক

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বর্তমান সংকটের সূত্রপাত ২০২১ সালে। ২০১৭ সালে এই স্কুলে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৭ জন যোগ্য শিক্ষক ও কর্মচারীকে ২০২১ সালে স্থায়ী করার সময় সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ নুরুল আলম-এর তত্ত্বাবধানে শিক্ষক প্রতিনিধি এরশাদ হোসেন, শিরিন সুলতানা এবং বর্তমান চক্রের মাসুদ রানা, নাসির উদ্দীন ও শামীমা সুলতানা (শিরিন সুলতানার আপন বোন) মিলে একটি বড় অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। কিন্তু ওই ১৭ জন শিক্ষক-কর্মচারী ঘুষ না দিয়েই নিয়ম অনুযায়ী চাকরি স্থায়ী করতে সক্ষম হন।

ঘুষ না পেয়ে ক্ষিপ্ত হওয়া এই সিন্ডিকেটটি তখন থেকেই উক্ত ১৭ জনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে, মাসুদ রানা ও নাসির উদ্দীনের সিন্ডিকেটটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ‘সমন্বয়কদের’ ভুল বুঝিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ওই ১৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি ভুয়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দাখিল করে। বর্তমানে এই ভুয়া অভিযোগের ভিত্তিতেই নিরীহ শিক্ষকদের দুদকের মাধ্যমে হেনস্তা করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী মহলের অভিযোগ।

ভুক্তভোগী ১৭ জন শিক্ষক ও কর্মচারী হলেন: সায়েরা বিবি (সহকারী শিক্ষক), ফারহানা আক্তার (সহকারী শিক্ষক), দিনার বিনতে তালেব (জুনিয়র শিক্ষক), জেসমিন আকতার (জুনিয়র শিক্ষক), শাহানা মুশতারী (জুনিয়র শিক্ষক), ফাহমিদা কাদের শোভা (জুনিয়র শিক্ষক), খালেদা বেগম (জুনিয়র শিক্ষক), মারিয়া নার্জিছ (জুনিয়র শিক্ষক), শারমিন জাহান, হাছিনা আক্তার, তৌহিদা মমতাজ (জুনিয়র শিক্ষক), দোলা রায় (জুনিয়র শিক্ষক), অ্যানি নাগ, পিংকি রানী দে (সহকারী শিক্ষক), স্বপ্না সেন, ফাহমিদা সুলতানা এবং ইসমত আরা বেগম।

চউক চেয়ারম্যানকে অন্ধকারে রেখে সাজানো তদন্ত

তদন্তের নামে ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের আরও একটি নজির স্থাপন করেছেন বর্তমান অধ্যক্ষ আবু হেনা মোস্তফা কামাল। গভর্নিং বডির সভাপতি তথা চউক চেয়ারম্যানের কোনো রকম পূর্বানুমোদন বা নির্দেশ ছাড়াই, তিনি দুদকের চিঠির অজুহাতে নিজস্ব পছন্দের লোক দিয়ে একটি একপেশে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির সদস্যরা হলেন—মোহাম্মদ বায়োজিদ, দেবাশীষ রঞ্জন সুশীল, শামীমা সুলতানা (যিনি নিজে ঘুষ সিন্ডিকেটের অন্যতম অভিযুক্ত) এবং মাহমুদা পারভীন

আইনজ্ঞদের মতে, চউকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চউক চেয়ারম্যানকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, নিজস্ব সিন্ডিকেটের লোক দিয়ে সাজানো প্রতিবেদন তৈরি করে সরাসরি দুদকে প্রেরণ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সাধারণত কোনো নিয়োগে অনিয়ম হলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারা কমিটি গঠন করা আবশ্যক হলেও, এখানে অভিযুক্তদের দিয়েই কমিটি গঠন করে প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।

শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুদ রানার নিজস্ব নিয়োগেই জালিয়াতি!

অনুসন্ধানে শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুদ রানার নিজের নিয়োগ নিয়েই এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ২০১২ সালের ১০ এপ্রিল ‘দৈনিক আজাদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে প্রভাষক (হিসাববিজ্ঞান) পদে নিয়োগ পরীক্ষায় ‘তাহমিনা আক্তার’ নামের এক প্রার্থী মেধা তালিকায় ২য় স্থান অর্জন করেন। ১ম স্থান অধিকারী যোগদানে অপরাগতা প্রকাশ করলে নিয়ম অনুযায়ী ২য় স্থানে থাকা তাহমিনা আক্তারের নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু ৩য় স্থানে থাকা মাসুদ রানা তৎকালীন অধ্যক্ষের সাথে যোগসাজশ করে তাহমিনা আক্তারের নামে ইস্যুকৃত অফিশিয়াল নিয়োগপত্রটি সম্পূর্ণ গোপন করেন। উল্টো তাহমিনা আক্তারের একটি ভুয়া ও জাল স্বাক্ষরযুক্ত ‘যোগদানে অনিচ্ছা পত্র’ তৈরি করে দাখিল করা হয়। এই জালিয়াতির মাধ্যমে বিগত ১৫ বছর ধরে অবৈধভাবে পদটি দখল করে আছেন মাসুদ রানা।

অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য:

  • মাসুদ রানা (অভিযুক্ত শিক্ষক প্রতিনিধি): “আমাকে ফোন করে তৎকালীন অধ্যক্ষ নুরুল আলম নিয়োগপত্র দিয়েছেন, জালিয়াতির বিষয়ে আমি অবগত নই।”

  • তাহমিনা আক্তার (নিয়োগ বঞ্চিত ভুক্তভোগী): “নিয়োগ পরীক্ষায় আমি ২য় স্থান অধিকার করেছি তা ২০২৩ সালে জানতে পারি। গত ১৪/০৫/২০২৫ইং তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি।”

মাউশি অধিদপ্তর বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ২৯/০৬/২০২৫ইং তারিখে মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক ও সহকারী পরিচালককে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিলেও অদৃশ্য ইশারায় বা সমন্বয়কদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সেই তদন্ত আজ অবধি আলোর মুখ দেখেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি চট্টগ্রামের পরিচালক প্রফেসর ফজলুল কাদের জানান, “সিডিএ স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগের তদন্ত চলমান। উল্লেখিত অভিযোগের বিষয়ে ফাইল না দেখে এই মুহূর্তে কিছুই বলা যাচ্ছে না।”

বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও চউক চেয়ারম্যানের আশ্বাস

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ৫ আগস্টের পর যারা “সমন্বয়ক” বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের নাম ভাঙিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন, তারা প্রকারান্তরে পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদেরই পুনরাবৃত্তি করছেন। একজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো, ভুয়া স্বাক্ষর দিয়ে অন্যের চাকরি চ্যুত করা এবং বৈধ শিক্ষকদের দুদকের মাধ্যমে হয়রানি করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রম আইনের চরম লঙ্ঘন।

সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং নিরীহ ১৭ জন শিক্ষকের ওপর চলমান মানসিক হয়রানি বন্ধে মাউশি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং চউক কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) নবাগত চেয়ারম্যান ও সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এর পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন:

“কোনো প্রকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”