back to top

বন্দরে ‘গোপন রেটকোড’ বাণিজ্য: দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ!

প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৬ ০৬:১৯

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নৌ-প্রকৌশল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি ক্রয়নীতি (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের গোপন তথ্য ফাঁস, শর্তে অসঙ্গতি সৃষ্টি, এমনকি দরপত্র বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ঠিকাদাররা।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী (মেরিন) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন এবং জলযান শাখার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আফছার উদ্দিন।

ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বছরের পর বছর ধরে ওটিএম ও ই-জিপি পদ্ধতির টেন্ডারে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গোপনে ‘রেটকোড’ সরবরাহ করা হচ্ছে।

মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আগেভাগে দরমূল্যের ধারণা পেয়ে যায় পছন্দের ঠিকাদাররা। ফলে তারা নিখুঁত দর দিয়ে সহজেই কাজ বাগিয়ে নেয়।

অন্যদিকে সাধারণ ঠিকাদাররা পে-অর্ডার, সিডিউল ও অন্যান্য ব্যয় বহন করেও প্রতিযোগিতা থেকে কার্যত ছিটকে পড়ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, রেটকোড ফাঁসের পাশাপাশি দরপত্রের শর্তও এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা অযোগ্য হয়ে পড়ে।

ছোট কাজের জন্য অস্বাভাবিক কঠিন শর্ত আরোপ করা হলেও একই ধরনের বড় কাজে সেই শর্ত রাখা হয় না।

ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টোর রেক সম্পাদনের মতো ছোট কাজে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবিসি সনদ। অথচ বন্দরের আরও বড় প্রকল্পেও এমন সনদের প্রয়োজন হয়নি।

একইভাবে পল্টুন বার্জ-২০ এর একটি ছোট মেরামতকাজে আইএসও সনদ বাধ্যতামূলক করা হলেও পল্টুন বার্জ-২ এর মেরামতকাজে সেই শর্ত রাখা হয়নি।

জরিপ স্টিয়ারিং সিস্টেম উইঞ্জ মেরামত ও জরিপ-১০ ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের মতো কাজেও পিওএমএমডি সার্টিফিকেট ও ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অথচ একই ধরনের আরও বড় কাজ স্থানীয় ডিলারের মাধ্যমে করানো হয়েছে, যেখানে এসব সনদের প্রয়োজন হয়নি।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, এ ধরনের অসঙ্গতি বিচ্ছিন্ন নয়; নৌ-প্রকৌশল বিভাগের প্রায় প্রতিটি দরপত্রেই একই কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে। কাজের ধরন একই হলেও শর্ত বদলে দেওয়া হচ্ছে পরিস্থিতি অনুযায়ী।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত বছর প্লেট সরবরাহ ও গেট বাল্ব সরবরাহের একটি টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদার কাজ না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে পুরো দরপত্র বাতিল করা হয়।

পরে নতুন শর্ত যুক্ত করে ম্যানুয়াল টেন্ডারের মাধ্যমে সেই প্রতিষ্ঠানকেই কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

ঠিকাদারদের দাবি, অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়েও চলছে ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ। কার্যাদেশে একক ওয়ার্ক অর্ডারের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও যেসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে, তাদের অনেকের সেই অভিজ্ঞতা নেই।

আবার পিপিআরে বাধ্যতামূলক নয়—এমন নথিও ছোট কাজের ক্ষেত্রে জোর করে চাওয়া হচ্ছে।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহ্বান করা একাধিক টেন্ডারের শর্ত সহজ করার দাবিতে ইতিমধ্যে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করেছে বলে জানা গেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঠিকাদারদের একাংশের অভিযোগ, উচ্চপর্যায়েও অভিযোগ জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।

এদিকে অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী ও বর্তমানে পলাতক কিছু ঠিকাদারকেও নানা কৌশলে আবার কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক এবং সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আফছার উদ্দিনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোন বার্তা পাওয়া যায়নি। সূত্র-স সময়। তাঁদের বক্তব্য পেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

তবে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক এসব অভিযোগ, শর্তের অসঙ্গতি এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ এখন বন্দরজুড়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয় অনুসন্ধান ছাড়া প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে না।