চট্টগ্রাম কলেজ অডিটোরিয়ামে মঙ্গলবারের সকালটা ছিল আসন্ন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রস্তুতি ঘিরে ব্যস্ত।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন বিভিন্ন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা একত্র হয়েছিলেন পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে।
তবে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির বাইরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে দেশের শিক্ষার গুণগত মান, নৈতিক শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রশ্ন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু শিক্ষার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি।
তাঁর মতে, শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।
তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে বাংলাদেশে নকল নির্মূলে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তাঁর আশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া শিক্ষার মানোন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার যে ভিশন নিয়ে কাজ করছেন, তা বাস্তবায়নে শিক্ষামন্ত্রী অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।
তিনি এমন একটি প্রজন্মের কথা বলেন, যারা নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মনে করেন, শুধু পাসের হার বৃদ্ধি কোনো শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটিয়ে তাদের প্রকৃত শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যানে অনেক প্রতিষ্ঠানের পাসের হার এখনও সন্তোষজনক নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণ খুঁজে বের করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা কঠিন হবে।
সমাজের বর্তমান বাস্তবতায় কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নৈতিক শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে পারলে একটি সুস্থ, মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠন সহজ হবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে মেয়র বলেন, সিটি কর্পোরেশনের অধীনে বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়, কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে চসিক ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তবে তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতন করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন হেলথ কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে বলেও জানান তিনি।
মেয়রের মতে, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
স্কুল পর্যায় থেকেই যদি পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, নদী ও প্রকৃতি রক্ষা এবং টেকসই নগর গঠনের বিষয়গুলো শিক্ষার অংশ করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
সভা শেষে তাঁর আশাবাদী উচ্চারণ ছিল—বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আসবে।
নৈতিক শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়ে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।
আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজিত সভাটি তাই কেবল পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার আলোচনা নয়, বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, শিক্ষার মান এবং আগামী প্রজন্মকে কেমন বাংলাদেশ উপহার দেওয়া হবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
আজ চট্টগ্রাম কলেজ অডিটোরিয়ামে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ উপলক্ষে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
চট্টগ্রামের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

