back to top

ট্র্যাজেডি, পুনরুত্থান আর বিশ্বজয়ের মহাকাব্য: ৩৯-এ লিওনেল মেসি

প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬ ০৫:০৮

আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের ধুলোবালি উড়তে থাকা রাস্তায় এক ছোট্ট ছেলে পায়ে বল জড়িয়ে দৌড়ে বেড়াত।

প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের একের পর এক কাটিয়ে যাওয়ার সেই অসাধারণ ক্ষমতা দেখে হয়তো অনেকেই বিস্মিত হতেন, কিন্তু খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিলেন—এই শারীরিকভাবে দুর্বল বালক একদিন বিশ্ব ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দেবেন।

আজ ২৪ জুন। ফুটবল ইতিহাসের সেই অবিসংবাদিত জাদুকর, লিওনেল মেসির ৩৯তম জন্মদিন।

গত দুই দশক ধরে যিনি কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে উপহার দিয়েছেন আবেগ, বিস্ময়, আনন্দ এবং এক জীবন্ত মহাকাব্যের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ।

তবে এই গল্পের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না।

শৈশবে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি তাঁর স্বপ্নকে প্রায় থামিয়ে দিতে বসেছিল। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা চিকিৎসার পথকে কঠিন করে তুলেছিল।

ঠিক সেই সময় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয় একটি সাধারণ ন্যাপকিন পেপার।

সেই ন্যাপকিনেই স্বাক্ষরিত হয়েছিল বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তি, যা বদলে দেয় এক কিশোরের জীবন এবং পরবর্তীতে বদলে দেয় ফুটবল বিশ্বকেও।

ক্যাম্প ন্যুতে আগমন ঘটে খুদে সেই প্রতিভার। লম্বা চুলের, ১৯ নম্বর জার্সি পরা তরুণ মেসি যখন রোনালদিনহোর পাস থেকে আলতো চিপে ক্যারিয়ারের প্রথম গোলটি করেন, তখনই যেন শুরু হয়েছিল নতুন এক যুগের।

পরবর্তীতে পেপ গার্দিওলার অধীনে ‘ফলস নাইন’ পজিশনে খেলে ফুটবলে নতুন এক দর্শনের জন্ম দেন তিনি।

প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বিভ্রান্ত করে, খেলার ছন্দকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে তিনি দেখিয়ে দেন—ফুটবল কেবল শক্তি বা গতির খেলা নয়, এটি বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পেরও নাম।

একের পর এক ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য ট্রফি এবং অগণিত রেকর্ডে যখন ভরে উঠছিল তাঁর ক্যারিয়ার, তখন মনে হচ্ছিল ফুটবল যেন এক মহাতারকার পায়ের কাছেই এসে থেমে গেছে।

কিন্তু সাফল্যের ঝলমলে আলোর আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর এক বেদনা।

বার্সেলোনার জার্সিতে যিনি ছিলেন অপরাজেয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনিই বারবার হয়ে উঠছিলেন এক ট্রাজিক হিরো।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে মারাকানায় বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে মেসির নীরব হেঁটে যাওয়া দৃশ্য আজও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে আছে।

এরপর টানা দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার, ২০১৬ সালের সেই হৃদয়ভাঙা রাত এবং ডাগআউটে বসে শিশুর মতো কান্না—সবকিছুই যেন তাঁকে আরও মানবিক করে তুলেছিল।

সমালোচনা, হতাশা এবং ব্যর্থতার ভারে একসময় জাতীয় দল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ইতিহাসের মহান নায়কেরা কখনও অসমাপ্ত গল্প রেখে বিদায় নেন না।

এরপর শুরু হয় প্রত্যাবর্তনের অধ্যায়।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০২১ সালে। ব্রাজিলের মাটিতে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা তুলে নেন মেসি।

সেই ট্রফি ছিল কেবল একটি শিরোপা নয়; ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা বেদনার অবসান।

তবে নিয়তি তাঁর জন্য আরও বড় মঞ্চ প্রস্তুত করে রেখেছিল। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ।

৩৫ বছর বয়সে, কোটি মানুষের স্বপ্ন আর প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে মেসি নামেন তাঁর শেষ বিশ্বকাপ মিশনে।

প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারার পর আর্জেন্টিনাকে নিয়ে শুরু হয় শঙ্কা। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য পুনর্জন্মের গল্প।

মেক্সিকোর বিপক্ষে দূরপাল্লার সেই দুর্দান্ত গোল, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অসাধারণ পাসিং জ্যামিতি এবং ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্সের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা কাহিনি।

লুসাইল স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে শেষ শটটি জালে জড়ানোর পর মেসির হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসের চিরস্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।

কালো ‘বিশত’ পরে যখন তিনি অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন, তখন মনে হয়েছিল ফুটবল নিজেই যেন তার দীর্ঘদিনের একটি অপূর্ণতা পূরণ করে ফেলেছে।

আজ ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে ইন্টার মায়ামির জার্সিতে খেলছেন তিনি। এখন আর কোনো প্রমাণ করার চাপ নেই, নেই সমালোচকদের জবাব দেওয়ার তাড়না।

এখন তিনি খেলেন আনন্দের জন্য, খেলেন ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে রোমান্টিকতার শেষ আলোটুকু জ্বালিয়ে রাখার জন্য।

৮টি ব্যালন ডি’অর কিংবা শত শত রেকর্ড তাঁর অর্জনের অংশ মাত্র। মেসির প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়—পায়ে বল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামজুড়ে নেমে আসা সেই প্রত্যাশাময় নীরবতায়, যেখানে কোটি মানুষ জানে, পরের মুহূর্তেই হয়তো অসম্ভব কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

লিওনেল মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি অনুভূতি, একটি প্রজন্মের স্মৃতি, একটি অসম্ভব স্বপ্নের বাস্তব রূপ।

শুভ জন্মদিন, লিওনেল মেসি।

আমাদের প্রজন্মে একটি রূপকথাকে সত্যি করে তোলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।