টেক্সাসের এটিএন্ডটি স্টেডিয়ামের আলো তখনও ঝলমল করছে। গ্যালারিজুড়ে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা উল্লাস, আর মাঠের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন এক মানুষ, যিনি যেন বছরের পর বছর ধরে ফুটবলকে নিজের মতো করে নতুন সংজ্ঞা দিয়ে চলেছেন।
২২ জুনের রাতটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে আরেকটি বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকল লিওনেল মেসির জন্য।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতেছে ২-০ ব্যবধানে। কিন্তু স্কোরলাইনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মেসির অর্জন। জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন।
শুধু পুরুষদের বিশ্বকাপ নয়, নারী-পুরুষ মিলিয়ে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি মার্তার ১৭ গোলের রেকর্ডও পেরিয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এখন বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ১৮।
তবে এই রাতের গল্প শুরু হয়েছিল ভিন্নভাবে। ম্যাচের ৮ম মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি কাজে লাগাতে পারেননি মেসি। অনেকের কাছে সেটি হতে পারত হতাশার মুহূর্ত।
কিন্তু দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার তাকে শিখিয়েছে, বড় খেলোয়াড়দের গল্প কখনো একটি ভুলে থেমে যায় না।
৩৮ মিনিটে সেই উত্তরই দিলেন তিনি। আর্জেন্টিনার দ্রুতগতির আক্রমণ থেকে বল পেয়ে বাম পায়ের নিখুঁত ফিনিশে গোল করেন। সেই গোলেই ভেঙে যায় মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড। এরপর যোগ করা সময়ে আরেকটি গোল করে বিশ্বকাপের নতুন একক শীর্ষে উঠে যান মেসি।
এ যেন শুধু দুটি গোল নয়, সময়কে হার মানানোর এক প্রতীকী ঘোষণা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেই তরুণ ফরোয়ার্ড আজ ২০২৬ সালে এসে খেলছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এত দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা নিজেই এক বিরল কীর্তি।
তার বিশ্বকাপ গোলগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যায় এক বিস্তৃত ভৌগোলিক মানচিত্র।
সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো থেকে শুরু করে বসনিয়া, ইরান, নাইজেরিয়া, সৌদি আরব, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া, ফ্রান্স, আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া—বিভিন্ন প্রজন্মের বিভিন্ন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ছড়িয়ে আছে তার ১৮ গোলের গল্প।
বিশেষ করে ২০২২ বিশ্বকাপ ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায়, যেখানে তিনি করেছিলেন সাত গোল।
আর চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই পাঁচ গোল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বয়স তার প্রতিভাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু গোল করা নয়; ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করা, চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দলের আত্মবিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা। বয়স ৩৮ হলেও তার খেলায় এখনো সেই সূক্ষ্মতা, সেই দূরদৃষ্টি এবং সেই অনন্য সৃজনশীলতা অটুট।
এই জয়ে গ্রুপ জে থেকে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
লিওনেল স্কালোনির দল এখনো অপরাজিত। আর মেসি যখন এমন ছন্দে আছেন, তখন শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নটাও আর অবাস্তব মনে হচ্ছে না।
রেকর্ড ভাঙার ঘটনা খেলাধুলায় প্রায়ই ঘটে। কিন্তু কিছু রেকর্ড শুধু পরিসংখ্যানের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
মেসির ১৮ গোলের মাইলফলকও তেমনই এক অর্জন। এটি প্রতিভা, দীর্ঘায়ু, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় এবং ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার এক অসাধারণ গল্প।
টেক্সাসের সেই রাত শেষ হয়েছে। কিন্তু মেসিকে ঘিরে আলোচনার শেষ এখনো অনেক দূরে। কারণ ইতিহাস বলছে, তিনি যখন মাঠে নামেন, তখন নতুন ইতিহাসের সম্ভাবনাও সঙ্গে নামতে থাকে।
ফুটবলপ্রেমীরা তাই অপেক্ষায়—পরবর্তী ম্যাচে আবারও কী নতুন কোনো অধ্যায় লিখবেন লিওনেল মেসি?
এক নজরে দেখে নিন বিশ্বকাপে মেসি কাদের বিপক্ষে কয়টি গোল করেছেন
২০০৬ বিশ্বকাপ: ১ গোল
সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো – ১ গোল
২০১৪ বিশ্বকাপ: ৪ গোল
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা – ১ গোল
ইরান – ১ গোল
নাইজেরিয়া – ২ গোল
২০১৮ বিশ্বকাপ: ১ গোল
নাইজেরিয়া – ১ গোল
২০২২ বিশ্বকাপ: ৭ গোল
সৌদি আরব – ১ গোল
মেক্সিকো – ১ গোল
অস্ট্রেলিয়া – ১ গোল
নেদারল্যান্ডস – ১ গোল
ক্রোয়েশিয়া – ১ গোল
ফ্রান্স – ২ গোল
২০২৬ বিশ্বকাপ :
৫ গোল (চলমান)
আলজেরিয়া – ৩ গোল
অস্ট্রিয়া – ২ গোল

