সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, সুপ্রভাত চট্টগ্রাম অনলাইন-এ প্রকাশিত অনুসন্ধানের সূত্র ধরে অভ্যন্তরীণ তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় বিতর্কিত ওসি মাহফুজুর রহমানকে শাস্তিমূলকভাবে দূরবর্তী রাজশাহী রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের কয়েক দিনেই দৃশ্যপট বদল
গত ১৫ জুন দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন-এ “বোয়ালখালী থানার ভেতরে কী চলছে, ওসিকে নিয়েই যত বিতর্ক!” এবং সুপ্রভাত চট্টগ্রাম অনলাইন-এ “বোয়ালখালী থানায় আইনের শাসন নাকি ওসির ‘খেয়ালখুশি’? জনআস্থার চরম সংকটে পুলিশ বাহিনী” শিরোনামে দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন দুটি প্রকাশের পর জেলা পুলিশ ও ঊর্ধ্বতন মহলে তোলপাড় শুরু হয়।
প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হলেও তাদের জবাব সন্তোষজনক ছিল না। ফলশ্রুতিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের তাৎক্ষণিক বোয়ালখালী থানা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জুন বোয়ালখালী থানার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন। বিদায়ী ওসি মাহফুজুর রহমান তাঁর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে থানা ত্যাগ করেন। দায়িত্ব নিয়েই নতুন ওসি থানায় ‘সেবামুখী পুলিশিং’ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
যে সব গুরুতর অভিযোগে ফেঁসে গেলেন ওসি মাহফুজ ও এসআই মাসুদ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী ওসি মাহফুজ ও এসআই মাসুদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের দীর্ঘ খতিয়ান উঠে এসেছে:
১. রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও থানা হাজতে নির্যাতন
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি ছিল রাজনৈতিক নিপীড়নের। তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে ওসির বিরুদ্ধে। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদের নামে থানা হাজতে একা পেয়ে এক যুবদল নেতাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও তদন্তে উঠে আসে।
২. ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে টাকার বিনিময়ে মুক্তি
সিআর মামলা ১৪৬/২৩-এর ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি মো. মুজিবকে গত ১১ জুন গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাদীপক্ষের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের জন্য তারা পুলিশকে ২০ হাজার টাকা দেয়, অথচ এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মোটা অঙ্কের অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে আসামিকে আদালত না পাঠিয়ে থানা থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। তৎকালীন ওসির দাবি ছিল ‘ওয়ারেন্টের মূল কপি না পাওয়ায়’ তাকে ছাড়া হয়েছে, যা প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
৩. ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে হামলা ও সিসিটিভি ফুটেজ
গত ১২ জুন পৌরসভা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুল ইসলামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘খাজা এন্টারপ্রাইজ’-এ ঢুকে দুই কর্মচারীকে নির্মমভাবে মারধর করেন এসআই মো. মাসুদ আলম মোল্লা। এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
৪. মাদক সখ্য ও মামলার ভয় দেখিয়ে বাণিজ্য
অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শুরুতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও ওসি মাহফুজ দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের সখ্য গড়ে ওঠে। এছাড়া জুলাই হত্যাকাণ্ডের অজ্ঞাতনামা মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগও ছিল নিত্যদিনের।
স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
এদিকে বিতর্কিত এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহারের খবরে বোয়ালখালীর সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীদের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে। অনেকেই দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন এবং সুপ্রভাত চট্টগ্রাম অনলাইন অফিসে ফোন করে সাংবাদিকদের সাহস ও সততার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন,
“গত ৫ আগস্টের পর আমরা ভেবেছিলাম পুলিশের জুলুম কমবে। কিন্তু ওসির অনিয়মে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। গণমাধ্যমের এই ভূমিকা আমাদের আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।”
সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ: জবাবদিহিতার উদাহরণ
গণমাধ্যম ও সুশাসনের মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে পুলিশের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব (Fourth Estate)। বোয়ালখালী থানার এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যপ্রমাণভিত্তিক সাংবাদিকতা কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার রুখে দিতে পারে।
যদিও প্রশাসনিকভাবে ওসি মাহফুজকে রাজশাহী রেঞ্জে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে, তবে সুশীল সমাজ এবং আইনবিদদের মতে, কেবল বদলিই শেষ কথা নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারি কর্মকর্তা আইনের অপব্যবহার করার সাহস না পান।