back to top

জলাবদ্ধতার নগরী চট্টগ্রাম: রাস্তায় পানি, ঘরে পানি, থেমে গেল জনজীবন

প্রকাশিত: ০৮ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৪৯

টানা ভারী বর্ষণ, ওপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর নিচে কর্ণফুলী নদীর উত্তাল জোয়ার-এই তিনের সম্মিলিত মরণকামড়ে কার্যত এক অবরুদ্ধ দ্বীপে পরিণত হয়েছে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম

গত কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে নগরের রাজপথ থেকে গলিপথ, অভিজাত আবাসিক এলাকা থেকে জমজমাট বাণিজ্যিক কেন্দ্র-সবকিছুই এখন পানির নিচে। জুলাইয়ের চেনা বর্ষা এবার যেন রূপ নিয়েছে এক চরম দুঃস্বপ্নে।

আজ বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর গড়িয়ে গেলেও বহু এলাকা থেকে পানি না নামায় থমকে গেছে কোটি মানুষের এই নগরী।

অফিসগামী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী আর খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ পৌঁছেছে চরমে।

পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

একই সাথে স্থগিত করা হয়েছে চট্টগ্রামসহ তিন জেলার আজকের এইচএসসি পরীক্ষাও। শিক্ষা-দীক্ষা আর জীবিকার চাকা আজ যেন পুরোপুরি স্তব্ধ।

আজকের চট্টগ্রামের এক নজরে চিত্র:
* ২৪ ঘণ্টার রেকর্ড বৃষ্টিপাত
* চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
* হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
* পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের চরম ঝুঁকি

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে মৌসুমি বায়ু তীব্রভাবে সক্রিয় রয়েছে। সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে রেকর্ড হয়েছে কয়েক শ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

নগরের চকবাজার, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, বাদামতলী, হালিশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, কাতালগঞ্জ, মোহরা, পতেঙ্গা, শোলশহর, সিডিএ আবাসিক এলাকা কিংবা এক্সেস রোড-সবখানেই এখন হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি।

অনেক জায়গায় ড্রেন ও রাস্তার সীমানা মুছে গেছে। ফলে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

সড়কগুলোতে বিকল হয়ে পড়ে আছে সারি সারি যানবাহন। গণপরিবহন না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মজীবী মানুষের ক্ষোভ আর অসহায়ত্বে ভারী হয়ে উঠেছে নগরের বাতাস।

হাজার কোটির প্রকল্প, তবু কেন এই নিয়তি?

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত বছরগুলোতে খরচ হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। খাল খনন, ড্রেন সংস্কার, স্লুইসগেট নির্মাণ ও ড্রেজিংয়ের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

সরকারি পক্ষ থেকে বারবারই দাবি করা হয়েছিল, নগরের জলাবদ্ধতা এবার নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু চলতি বর্ষার প্রথম বড় ধাক্কাতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে সেই আশার বাণী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন: “শুধু খাতা-কলমে খাল খনন করলেই হবে না। খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা এবং সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এই হাজার কোটির প্রকল্প কেবল কাগজের নৌকা হয়েই ভেসে যাবে।“

বানের জলে ভাসছে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন

এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। রিকশাচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় আজ পুরোপুরি বন্ধ। নিচু এলাকার বস্তি ও কাঁচা ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে জমানো খাদ্যসামগ্রী, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।

একই সাথে নোংরা ও দূষিত পানির কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

পাহাড়জুড়ে কান্নার হাতছানি

এদিকে সাগরের জোয়ার আর মেঘের বৃষ্টির পাশাপাশি নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়। টানা বর্ষণে নরম হয়ে পড়েছে নগর ও আশপাশের পাহাড়ি মাটি। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ভূমিধসের আশঙ্কা করছে জেলা প্রশাসন।

পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সকাল থেকেই চলছে মাইকিং। প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।

আকাশ এখনো মেঘলা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে-বৃষ্টির এই দাপট চলবে আরও কয়েক দিন।

বন্দরনগরীর মানুষ এখন চাতকের মতো চেয়ে আছেন আকাশের দিকে, আর মনে মনে খুঁজছেন এক স্থায়ী সমাধান।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে চট্টগ্রাম কি কেবলই ভাগ্যাহত, নাকি মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনার নির্মম শিকার-সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি জলমগ্ন নাগরিকের।