back to top

বিপৎসীমার ওপরে সাঙ্গু: ঘরে গলা সমান পানি, পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল!

আতঙ্কে দক্ষিণ-পূর্ব জনপদ

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই, ২০২৬ ০৮:২৩

পাঁচ দিনের টানা ভারী বর্ষণ যেন দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের জনজীবনকে এক অনিশ্চয়তার বৃত্তে আটকে ফেলেছে।

পাহাড়ি ঢল, ফুলেফেঁপে ওঠা নদী, ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ, তলিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎহীন জনপদ আর নিরাপদ পানির সংকট।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন এক বহুমাত্রিক মানবিক সংকটের মুখোমুখি।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় সাতকানিয়া অংশে সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, যা চলমান দুর্যোগে সর্বোচ্চ উচ্চতা।

একই সঙ্গে ডলু, টঙ্কাবতী, মাইনী ও চেঙ্গী নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বর্ষণের কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

দুর্যোগের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো, গত তিন দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড় ও দেয়ালধসে ২৯ জনের প্রাণহানি।

বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলীতে পাহাড়ধসে দুজন এবং বৃহস্পতিবার ভোরে বান্দরবানের লামার মিশনপাড়ায় পাঁচজন নিহত হন।

প্রতিটি নতুন বৃষ্টিধারা যেন পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোর মানুষের জন্য নতুন আতঙ্কের বার্তা নিয়ে আসছে।

সাঙ্গুর জলে ডুবেছে জনপদ

সাঙ্গু নদী শুধু বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি, তার সঙ্গে ভেঙে দিয়েছে দুই উপজেলার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার শেষ ভরসাটুকুও।

সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার প্রায় সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। উপজেলা পরিষদ, থানা এলাকা, গ্রামীণ সড়ক-সবই পানির নিচে।

এ অঞ্চলে নদী প্রতিরক্ষার স্থায়ী বাঁধ না থাকায় গ্রামীণ সড়কই দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধের ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু এবার সাঙ্গুর প্রবল স্রোতের কাছে সেই প্রতিরোধও টেকেনি।

নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকে পড়ছে, ডুবে যাচ্ছে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি। এক হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ফসল এখন পানির নিচে।

পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। তবুও অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে দ্বিধায়। কারণ ঘরে পড়ে থাকা সামান্য সম্পদটুকু রক্ষার দায়িত্বও তাঁদেরই।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, উপজেলার সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে।

প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছে, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে উদ্ধার দলও গঠন করা হয়েছে।

এদিকে পাউবো চট্টগ্রাম উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার জানিয়েছেন, বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই নতুন করে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বাঁশখালী: পানি নামছে না, বাড়ছে দুর্ভোগ

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় যেন সময় থমকে গেছে। বৃষ্টি থামলেও জমে থাকা পানি নামছে না। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের অধিকাংশ ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত পানি জমে রয়েছে।

পাহাড়ি ঢল ও বঙ্গোপসাগরের জোয়ার একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

ভেসে গেছে মাছের ঘের, পুকুরের মাছ, নষ্ট হয়েছে গৃহস্থালির আসবাবপত্র। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন।

বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মাহমুদুল ইসলাম বলেন, গত ৩০ বছরে এমন দুর্যোগ দেখেননি। তাঁর ভাষায়, পুরো ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িঘর দুই থেকে তিন ফুট পানির নিচে।

ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন জানিয়েছেন, তাঁর এলাকার অনেক অংশ গলা সমান পানিতে ডুবে রয়েছে। পানি দ্রুত না নামলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, উপজেলার ১১০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে ইউনিয়নগুলোতে সাড়ে ২৪ টন চাল পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী শুকনা খাবারও বিতরণ করা হবে।

খাগড়াছড়ি: পানির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার লড়াই

খাগড়াছড়িতে পরিস্থিতি প্রতিটি ঘণ্টায় আরও জটিল হচ্ছে। চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বেড়ে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

একের পর এক সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-সাজেক এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

অনেক মানুষকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন মানুষ, কোথাও আবার ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি নিয়ে অপেক্ষা করছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের।

দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ জানান, উপজেলার ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

তাঁদের জন্য খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে রাতে পানি কিছুটা কমলেও আবার বাড়তে শুরু করেছে।

জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় মোট ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে।

বিদ্যুৎহীন সাজেক, বিপাকে দীঘিনালা

দুর্যোগ শুধু পানিতেই সীমাবদ্ধ নেই। বন্যার পানি উঠে যাওয়ায় দীঘিনালার ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র সম্পূর্ণ ডুবে গেছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে বুধবার বিকেল থেকে দীঘিনালা উপজেলা ও সাজেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

মুঠোফোন চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না, ইন্টারনেট সংযোগ বিঘ্নিত, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহেও দেখা দিয়েছে সংকট।

দীঘিনালা বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী হিল্লোল বড়ুয়া জানিয়েছেন, পুরো উপকেন্দ্র পানির নিচে চলে যাওয়ায় দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। পানি নেমে গেলে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা শেষে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করা হবে।

পানিবন্দী মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে উঠছে সুপেয় পানির অভাব। বহু এলাকায় নলকূপ ডুবে গেছে।

বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি খাদ্য, ওষুধ ও শিশুখাদ্যের সংকটও বাড়ছে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ত্রাণ পৌঁছানোও কঠিন হয়ে উঠছে।

আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু ফেলে যেতে চাইছেন না।

ফলে তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাতেই বসবাস করছেন। পাহাড়ধসের আশঙ্কা, নদীর বাড়তে থাকা পানি এবং টানা বর্ষণ। সব মিলিয়ে তাঁদের সামনে অনিশ্চয়তার দীর্ঘ অপেক্ষা।

সামনে আরও কঠিন সময়ের আশঙ্কা

আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ নদীর পানি আরও বাড়তে পারে, নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়বে।

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদ আজ শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি নয়, তারা লড়ছে জীবন, জীবিকা, নিরাপত্তা ও টিকে থাকার সংগ্রামে।

নদীর স্রোত একদিন থামবে, পানি একসময় নামবে। কিন্তু এই দুর্যোগ যে ক্ষত মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে রেখে যাবে, তার প্রভাব বহুকাল ধরে বহন করতে হবে এই অঞ্চলের মানুষকে।