তদন্তের জাল যতই সংকুচিত হচ্ছে, ততই অস্থিরতা বাড়ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আলোচিত প্রকৌশলী দম্পতির অন্দরে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী নির্বাহী প্রকৌশলী ফারজানা মুক্তার বিরুদ্ধে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নেমেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
গত ৯ জুলাই মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক জরুরি স্মারকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এই দম্পতির বিপুল সম্পদের পাহাড় ও প্রশাসনিক অনিয়মের সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, গত ২৫ জুন চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে মেহেদী চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর এই দম্পতির নামে-বেনামে গড়ে ওঠা প্রায় ৫০ কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্যের খতিয়ান জমা দেওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে এক ভিন্ন নাটকীয়তা।
তদন্তের ঠিক এই সন্ধিক্ষণে এসে উচ্চশিক্ষার দোহাই দিয়ে সপরিবারে এক বছরের জন্য মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমতি চেয়ে চসিকের সংস্থাপন শাখায় আবেদন করেছেন শাহীন-উল ইসলাম।
আইনি প্রক্রিয়া ও জবাবদিহিতা এড়াতেই কি তাঁদের এই আকস্মিক বিদেশযাত্রার হিড়িক-তা নিয়ে চসিকের অলিতে-গলিতে এখন তুমুল গুঞ্জন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শাহীন-উল ইসলামের চসিকে কর্মজীবন শুরু হয়েছিল দৈনিক বেতনের ভিত্তিতে এক সাধারণ বিল্ডিং সুপারভাইজার (মাস্টাররোল) হিসেবে।
সেখান থেকে সাবেক এক নির্বাহী প্রকৌশলীর সুপারিশে অস্থায়ী প্রকৌশলী এবং পরবর্তীতে ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি স্থায়ী সহকারী প্রকৌশলী থেকে সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান।
নিয়মানুযায়ী এক বছর শিক্ষানবিশ থাকার কথা থাকলেও, রহস্যজনক প্রশাসনিক আশীর্বাদে মাত্র চার বছরের মাথায় ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ তিনি চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর মতো সর্বোচ্চ পদে আসীন হন।
জ্যেষ্ঠদের টপকে তাঁর এই পদোন্নতি চসিকের প্রকৌশলীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয়।
বিগত ছাত্র আন্দোলনের সময় নগরের সড়কবাতি বন্ধ রাখার ঘটনায় বিতর্কিত হলে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়।
কিন্তু অলৌকিক ক্ষমতার জোরে মাত্র এক বছরের মাথায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি আবারও চট্টগ্রামে ফিরে এসে মেকানিক্যাল ও সিভিল বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন।
স্বামীর ক্ষমতার ছায়ায় স্ত্রী ফারজানা মুক্তার উত্থানও কম নাটকীয় নয়। অস্থায়ী সহকারী প্রকৌশলী হয়েও ২০২৩ সালে কোনো স্থায়ী পদ ছাড়াই সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে চসিকের ২৫০ কোটি টাকার ‘পরিচ্ছন্ন কর্মী নিবাস নির্মাণ’ প্রকল্পের পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব পান তিনি।
যেখানে নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালক হতে হলে স্থায়ী কর্মকর্তা হওয়া বাধ্যতামূলক।
শুধু তাই নয়, দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও এই দম্পতি একক আধিপত্য কায়েম করেছিলেন। যেখানে অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের বড়জোড় ৫-৬টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হতো, সেখানে গত বছরের ৯ এপ্রিল এক অফিস আদেশে ফারজানা মুক্তার একক নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ ১০টি ওয়ার্ডের উন্নয়ন ও টেন্ডারসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই দম্পতির টেবিলে মোটা অঙ্কের ‘উৎকোচ’ না দিলে ফাইল আটকে থাকত মাসের পর মাস। আর এই পুরো সিন্ডিকেটের নেপথ্য গডফাদার ছিলেন চসিকের সাবেক প্রধান নির্বাহী শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে অস্ট্রেলিয়ায় অর্থ পাচার
অভিযোগের তালিকায় এই দম্পতির ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যে সম্পদের খতিয়ান উঠে এসেছে, তা চোখ কপালে তোলার মতো।
পাঁচলাইশের প্রাসাদ: নগরীর অভিজাত পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর রোডের ২৪ নম্বর বাড়িতে (সিপিডিএল ছখিনা ধারা বারীষা) রয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট (১১/ডি)।
বেনামি প্লট ও জমি: নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বেনামি ফ্ল্যাট ও প্লট ছাড়াও নিজের গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালী উপজেলায় কিনেছেন বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অকৃষি জমি।
বিলাসী জীবন ও অস্ট্রেলিয়া কানেকশন: এই দম্পতি চড়েন কোটি টাকার দামি গাড়িতে। দুই সন্তান আরহাব ও আরহামকে পড়ান নগরীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ‘সিজিএস’ এ।
এছাড়া শাহীন তাঁর শ্যালকের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় কোটি কোটি টাকা পাচার করে সেখানে গাড়ি-বাড়ি কিনেছেন বলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে মন্ত্রণালয়ে।
অতীতের অনিন্দ্য রেকর্ড বলছে, ২০১৭ সালেও সহকর্মীর সাথে অসদাচরণ ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে শাহীনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও পরে আদালতের রায়ে তিনি ফিরে আসেন।
এবারও তদন্তের মুখোমুখি হয়ে ফারজানা মুক্তা বলছেন, “প্রমাণ না দেখা পর্যন্ত মন্তব্য করব না,” অন্যদিকে শাহীন উল ইসলাম যথারীতি এড়িয়ে গিয়ে বলছেন,“সব কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে হয়েছে।”
তবে বর্তমান চসিক প্রশাসন এবার কোনো ছাড় দিতে নারাজ। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, “এই দম্পতির অনিয়ম-দুর্নীতির কিছু তথ্য আমি পেয়েছি। অফিসিয়াল তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হবে। চসিকে দুর্নীতি করে কারও রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমার অবস্থান জিরো টলারেন্স।”
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির সদস্য ও সহকারী সচিব আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সূত্র-সি পোষ্ট
চসিকের সাধারণ কর্মকর্তা ও নগরবাসী এখন দেখার অপেক্ষায় আছেন-আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এই ক্ষমতাধর দম্পতির দুর্নীতির থলের বিড়াল শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসে, নাকি মালয়েশিয়া যাওয়ার বিমান ধরে তাঁরা নিরাপদেই পার পেয়ে যান।
