‘বাবা হাসপাতালে ভর্তি, তোমাকে নিয়ে যেতে পাঠিয়েছেন’-এক চালকের মুখে এমন কথা শুনেই সিএনজি অটোরিকশায় উঠে বসেছিল মাত্র ৭ বছরের নিষ্পাপ শিশু ওয়াসিফা জান্নাত তাসকিন।
এরপর কেটে যায় ঘোর উদ্বেগের দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টা। অবশেষে পুলিশের চোখবান্ধা তৎপরতা আর প্রযুক্তির বাঁধনে হার মেনেছে অপরাধীরা। অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে শিশুটিকে।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার পশ্চিম সরফভাটা ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) স্কুলের নার্সারি শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসকিন গত ২০ জুলাই সকালে স্কুলে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি।
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় যখন পরিবার দিশেহারা, ঠিক তখনই বাবার পাশাপাশি থেকে মেয়েকে খোঁজার নাটক চালিয়ে যাচ্ছিলেন আপন মামাতো ভাই মো. ফয়সাল (৩২)।
তবে এই উদ্বেগের ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ভয়ঙ্কর লোভ। ফয়সাল কেবল খোঁজাখুঁজিতেই অংশ নেননি, বরং সুযোগ বুঝে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে মুক্তিপণ দাবি করেন।
কিন্তু সন্দেহের তীর যখন জোরালো হয় এবং স্বজনেরা শিশুটিকে ভিডিও কলে দেখতে চান, তখন ঝটপট কল কেটে দেন তিনি।
শিশুটির বাবা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন জানান, ঘটনার পর থেকে ফয়সাল আমার সাথেই ছিল, মেয়েকে খুঁজে পেতে সহযোগিতার নাটক করছিল।
অথচ সেই-ই মূল পরিকল্পনাকারী! মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফোন করে মুক্তিপণ চায়। ভিডিও কলে দেখতে চাইলে আর দেখায়নি।
পরে দেলোয়ার হোসেন দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করলে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশ যৌথ অভিযান শুরু করে।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের নির্দেশনায় অভিযানটি পরিচালনা করা হয়।
শুরুতে অপহরণকারীদের অবস্থান নিশ্চিত না থাকলেও, চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) রাসেলের নেতৃত্বে পুলিশের বিশেষ দলটি প্রযুক্তির সহায়তা এবং সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ শুরু করে।
অবশেষে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দিবাগত রাত পৌনে ১২টায় সরফভাটা ইউনিয়নের পূর্ব প্রান্তে বালুরটাল এলাকার নির্জন একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে তাসকিনকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে পুলিশ মূল পরিকল্পনাকারী মো. ফয়সালসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ফয়সালের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন: গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন-মো. রাকিব (২২), মো. ফয়সাল (৩২) ও মো. জাহাঙ্গীর আলম (৫৫)। এর মধ্যে ফয়সাল মূল পরিকল্পনাকারী ও শিশুর বাবার মামাতো ভাই। রাকিব সিএনজি চালক ও সহযোগী এবং জাহাঙ্গীরও সিএনজি চালক।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাসাবাদে জানা যায়, ফয়সাল মুক্তিপণের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার লোভে পরিচিত দুই সিএনজি চালককে টাকার ভাগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এই অপহরণের ছক কষেছিলেন।
অপহরণে ব্যবহৃত সিএনজি অটোরিকশাটি জব্দ করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে।
