মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবার বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম বাড়তে থাকলে দেশে সার সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।
ডব্লিউএফপির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কৃষিতে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের প্রায় ৮০ শতাংশই সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে আমদানি করা হয়।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরিয়া আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ ইউরিয়া সার মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।
এরপর পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
ফলে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের বাজারেও সারের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুধু আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে তিনটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হলে দেশের নিজস্ব উৎপাদন দিয়ে ঘাটতি সামাল দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ডব্লিউএফপি সতর্ক করেছে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু সার সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
সংস্থাটির আশঙ্কা, সংকট আরও গভীর হলে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও জটিল করে তুলেছে সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী আনসার আল্লাহ (হুথি) জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবগামী দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি দাবি করেছে, লোহিত সাগরে আরোপিত সামুদ্রিক অবরোধ অমান্যের অভিযোগে এনসেলিয়া (ENCELIA) ও লায়লা (LAYLA) নামের দুটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
এ সময় ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হুথি।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলা অব্যাহত রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ততই অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
আর সেই অনিশ্চয়তার একটি বড় ধাক্কা এসে পড়তে পারে বাংলাদেশের কৃষি খাতে-যেখানে ইউরিয়া সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ইউরিয়া মজুত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ সার সরবরাহের এই সংকট শুধু কৃষকের মাঠেই থেমে থাকবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের খাদ্য উৎপাদন, বাজারদর এবং কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর। সূত্র: আল জাজিরা
