চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. রায়হানকে ধরতে অভিযান চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে নোয়াখালীতে পুলিশের অভিযানের সময় ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যান তিনি। এরপর থেকে তিনি পলাতক।
তবে আত্মগোপনে থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর উপস্থিতি থেমে নেই। বরং সেখান থেকেই দিয়েছেন হুমকিসূচক বার্তা-লিখেছেন, ‘ওয়েট অ্যান্ড সি।’
পুলিশের ভাষ্য, মো. রায়হান বিদেশে পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী এবং তাঁর সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অন্যতম সদস্য।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বাড়ির মালিকদের কাছে বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। চাঁদা না পেয়ে গুলিবর্ষণের একাধিক ঘটনাতেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছে পুলিশ।
৩৫ বছর বয়সী রায়হানের পড়াশোনা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। একসময় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন তিনি। তবে পুলিশের দাবি, ছদ্মবেশে চোলাই মদও বিক্রি করতেন রায়হান।
একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর সেখানে তাঁর পরিচয় হয় ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে রায়হান আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কথায় কথায় গুলি ছোড়ার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
পুলিশের দাবি, ছোট সাজ্জাদ সম্প্রতি কারাগারে গেলেও তাঁর অস্ত্রভান্ডারের দেখভাল করছেন রায়হান। একই সঙ্গে বড় সাজ্জাদের নেটওয়ার্কেও সক্রিয় রয়েছেন তিনি।
বড় সাজ্জাদের দলের আরেক সদস্য ‘সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গত ২৯ জুলাই রাতে অভিযান চালিয়ে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই দিন মো. রায়হানকে গ্রেপ্তার করতে নোয়াখালীতেও অভিযান চালানো হয়।
কিন্তু পুলিশের হাত থেকে সেবারও বেরিয়ে যান রায়হান। পরদিন ৩০ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, আমরা রায়হানকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলাম। রায়হান কোনোভাবে ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে গেছে।
এরপরই তিনি মন্তব্য করেন, রায়হান ‘জাহান্নাম না দেখলেও দোজখ দেখে ফেলেছে।’
পুলিশ সুপারের সেই মন্তব্যও এড়িয়ে যাননি রায়হান। ৩ আগস্ট নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘দোজখ আর জাহান্নামে তফাত কী মাসুদ স্যার?’ এরপর নোয়াখালীর মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি লেখেন, তারা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে।
এবার ফেসবুকে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’
পলাতক থাকার মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার আবারও ফেসবুকে সরব হন রায়হান। দীর্ঘ এক স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, তাঁর লোকজন জেলহাজতে বন্দী থাকায় তিনি একা হয়ে গেছেন। তবে স্ট্যাটাসের শেষদিকে গিয়ে তাঁর ভাষা হয়ে ওঠে আরও কঠোর-‘ওয়েট অ্যান্ড সি।’
পোস্টে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমার মতো শত শত স্টোরে রায়হান পড়ে আছে। নতুনরা পুরোনোদের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। খেলার মাঠে আগেই পরিচয় পেয়েছ, আপডেট পাবে ইনশা আল্লাহ।
পুলিশ জানিয়েছে, যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এসব পোস্ট দেওয়া হয়েছে, সেটি দীর্ঘদিন ধরে রায়হান ব্যবহার করছেন।
পুলিশের ধারণা, দলের লোকজন কারাগারে থাকলেও বড় সাজ্জাদের নির্দেশে তাঁর নতুন সহযোগীরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে-এমন বার্তাই দিতে চেয়েছেন রায়হান।
তবে রায়হানের এসব বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
রায়হানের ফেসবুক পোস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, পলাতক সন্ত্রাসী কত কথা বলবে। তাকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। রায়হানের পোস্টে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
পুলিশের অভিযানের বাইরে এখন রায়হানের আরেকটি মঞ্চ হয়ে উঠেছে ফেসবুক। একদিকে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপন, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক বার্তা-রায়হানের এই দ্বৈত উপস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এনেছে চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা।
পুলিশ বলছে, রায়হানকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আর পলাতক রায়হানের ফেসবুক বার্তার শেষ শব্দ-‘ওয়েট অ্যান্ড সি।’
