পাহাড়তলী ডিজেল শপে পাঁচ বছর একই দায়িত্বে থাকার অভিযোগ, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ, ঠিকাদার-সিন্ডিকেট, বাড়তি বিল ও দুদকের মামলা ঘিরে প্রশ্ন?
রেলের গুরুত্বপূর্ণ একটি কারখানা পাহাড়তলী ডিজেল শপ। সেখানে ইঞ্জিন মেরামত ও সচল রাখার কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) এতেশাম মো. শফিক।
অভিযোগ, অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই পদে থাকার সুযোগে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছেন।
সেই বলয়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের যোগসাজশ, নিম্নমানের বা ডুপ্লিকেট যন্ত্রাংশ ব্যবহার, বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে বিল এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আরও পড়ুন
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন অন্য জায়গায়-গত ১২ আগস্ট রেল মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক (পার্সোনেল-১) স্বাক্ষরিত আদেশে তাঁকে পার্বতীপুরে বদলি করা হলেও সেই আদেশ কেন কার্যকর হলো না?
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বদলি আদেশের পরও এতেশাম মো. শফিক পাহাড়তলী ডিজেল শপের দায়িত্ব ছাড়েননি। বরং রেলের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও তদবিরের মাধ্যমে বদলি ঠেকিয়ে তিনি একই দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। যদিও এ দাবির স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এতেশাম মো. শফিককে ঘিরে প্রশ্নের এখানেই শেষ নয়। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাও রয়েছে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল কবির পলাশ বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মালামালের পরিমাণ ও কাগজপত্র পরিবর্তন করে ক্রয়ের ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরির মাধ্যমে সরকারের ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৭২৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের মামলার পরও কীভাবে একজন কর্মকর্তা রেলের গুরুত্বপূর্ণ একটি কারখানার এমন স্পর্শকাতর দায়িত্বে দীর্ঘদিন বহাল থাকলেন-এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
পাঁচ বছর একই চেয়ারে
রেলওয়ে সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে পাহাড়তলী ডিজেল শপের কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এতেশাম মো. শফিক।
মাঝখানে অন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তদবিরের মাধ্যমে তিনি আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই দায়িত্বে থাকার ফলে তাঁর সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে।
এমনকি কমিশন বাণিজ্যের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ঠিকাদারদের সঙ্গে পার্টনারশিপে ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সূত্র-ডিএস
অভিযোগগুলোর বিষয়ে এতেশাম মো. শফিকের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বদলি আদেশ, তবু চেয়ার ছাড়েননি?
সবশেষ গত ১২ আগস্ট রেল মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক (পার্সোনেল-১) স্বাক্ষরিত এক আদেশে এতেশাম মো. শফিককে পার্বতীপুরে বদলি করা হয়।
কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আদেশ জারির পরও তিনি পাহাড়তলী ডিজেল শপের দায়িত্বে রয়েছেন।
এখানেই প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্নটি সামনে আসে। মন্ত্রণালয়ের একটি বদলি আদেশ জারি হওয়ার পর তা কার্যকর না হলে এর পেছনে প্রশাসনিক কারণ কী, কে সেটি স্থগিত বা পরিবর্তন করেছে, কিংবা আদেশটি বাস্তবায়নে বাধা কোথায়-এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই বদলি আদেশ কার্যকর হচ্ছে না।
যন্ত্রাংশে ‘মান’ বদলের অভিযোগ
পাহাড়তলী ডিজেল শপে রেলের ইঞ্জিন মেরামতের জন্য বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ ও মালামাল ব্যবহার করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এসব মালামাল সংগ্রহ ও ব্যবহারে মানের সঙ্গে আপস করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইএমডি (আমেরিকান) যন্ত্রাংশের পরিবর্তে ভারতীয় এবং অন্যান্য বিদেশি যন্ত্রাংশের পরিবর্তে দেশীয় নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে।
অভিযোগ সত্য হলে এর প্রভাব শুধু একটি কারখানার ক্রয়প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে মেরামতের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিলে একই ইঞ্জিন পুনরায় কারখানায় ফেরত আসতে পারে। এতে একদিকে মেরামতের ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে ইঞ্জিনের স্বাভাবিক ব্যবহারও ব্যাহত হয়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবেও মেরামত শেষে পাঠানো কিছু ইঞ্জিন দ্রুত ত্রুটিগ্রস্ত হয়ে আবার কারখানায় ফিরে আসছে।
‘নির্দিষ্ট’ উৎস থেকেই যন্ত্রাংশ?
অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের বা ডুপ্লিকেট যন্ত্রাংশ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে মালামাল তৈরি বা সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে সেলিম ও সহেল নামে দুই ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তাঁদের একজন নগরীর সিডিএ মার্কেটসহ কুমিল্লা ও ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে এবং অন্যজন কদমতলী এলাকা থেকে ডুপ্লিকেট যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেন।
এসব সরবরাহের সঙ্গে এতেশাম মো. শফিকের কমিশন লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে শাওন, সাইফুল, বাচ্চু, অর্ডেন, জাহিদ, রবিউল ও মোজাম্মেল নামের কয়েকজন ঠিকাদারের নাম উঠে এসেছে।
এ ছাড়া দ্য জায়েন্ট, এআরএম, এলাহি ব্রাদার্স, এলাহী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ টেক অ্যান্ড টেকনিক, জাহিদ ইন্টারন্যাশনাল ও এএনজি এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এসেছে।
এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এতেশাম মো. শফিকের সম্পর্কের ধরন কী, তাঁদের মধ্যে কারা নিয়মিত কাজ পেয়েছেন, কোন কোন ক্রয়াদেশে তাঁরা যুক্ত ছিলেন এবং বাজারদরের সঙ্গে বিলের পার্থক্য কত-এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ক্রয়সংক্রান্ত নথি, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, সরবরাহের চালান এবং মান যাচাইয়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা জরুরি।
দুই-তিন হাজারের পার্টস, বিল ১৮ হাজার?
অনুসন্ধানে ছোট-বড় বিভিন্ন যন্ত্রাংশের প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে বিল করার অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ‘উইক এসএ’ নামের একটি ছোট পার্টস। তাঁদের দাবি, বাজারে এর সর্বোচ্চ মূল্য দুই থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে হলেও সেটির বিপরীতে প্রায় ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল করার অভিযোগ রয়েছে। এটি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য অনিয়মেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।
৩৪ ইঞ্জিনের লক্ষ্য, কাজ শেষ ২২টির
পাহাড়তলী ডিজেল শপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে ইঞ্জিন মেরামতের পরিসংখ্যান নিয়েও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৪টি সিডিউল ইঞ্জিন ডেলিভারি দেওয়ার কথা থাকলেও ২২টি ইঞ্জিনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২টি ইঞ্জিন পিছিয়ে রয়েছে।
মেরামত শেষে যেসব ইঞ্জিন পাঠানো হচ্ছে, সেগুলোর কিছু দ্রুত ত্রুটিগ্রস্ত হয়ে পুনরায় কারখানায় ফিরে আসছে বলেও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
এই ব্যর্থতার কারণ কী-জনবল সংকট, যন্ত্রাংশের ঘাটতি, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নাকি অন্য কোনো কারণ-তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ কারিগরি ও প্রশাসনিক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
ইঞ্জিন সংকটের চাপ পড়ছে যাত্রীসেবায়
রেলের ইঞ্জিন সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের নির্ধারিত সময়ে ইঞ্জিন সরবরাহে ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সময়মতো ইঞ্জিন না পাওয়ায় ট্রেন পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে যাত্রীসেবায়ও।
এমনকি স্টেশনে দায়িত্ব পালনরত সাধারণ কর্মচারীদের সঙ্গে যাত্রীদের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দুদকের মামলা, তারপরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
এতেশাম মো. শফিকের বিরুদ্ধে দুদকের মামলার বিষয়টি এই পুরো ঘটনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মালামালের পরিমাণ ও কাগজপত্র পরিবর্তন করে ক্রয়ের ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরির মাধ্যমে সরকারের ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৭২৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলাটি হয়েছে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। কিন্তু এরপরও তিনি দীর্ঘদিন পাহাড়তলী ডিজেল শপের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কীভাবে বহাল ছিলেন-এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
কোটি টাকার বাজেট, তাই নজরদারিও জরুরি
রেলওয়ে সূত্রের দাবি, পাহাড়তলী ডিজেল শপে প্রতি অর্থবছরে কোটি কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ থাকে। এত বড় সরকারি অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালন, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, যন্ত্রাংশের মান নিয়ে প্রশ্ন এবং বাজারমূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ-সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি এখন কেবল ব্যক্তিগত অভিযোগের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করছেন, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বরাদ্দ থেকেও কমিশন নেওয়ার পরই এতেশাম মো. শফিক দায়িত্ব ছাড়বেন।
এই দাবিরও স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার স্বার্থে চলতি অর্থবছরের ক্রয়াদেশ ও অর্থছাড়ের নথিও পরীক্ষা করা যেতে পারে।
একজন কর্মকর্তাকে মন্ত্রণালয় বদলি করার পর সেই আদেশ কার্যকর হলো কি না-এটি প্রশাসনিক বিষয়। কিন্তু আদেশ কার্যকর না হলে এর লিখিত কারণ থাকা জরুরি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) এতেশাম মো. শফিকের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তীতে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
বিষয়গুলো নিয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীনের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে এতেশাম মো. শফিক বা রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
