কন্টেইনার খুলতেই বেরিয়ে এলো BMW-Lexus-এর ইঞ্জিন: নিলামের আড়ালে মানিলন্ডারিংয়ের ফাঁদ!

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:২৯

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ‘ইউজড স্পেয়ার পার্টস’ বা পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে আনা হয়েছিল একটি কনটেইনার

কাগজপত্রে সাধারণ পুরোনো যন্ত্রাংশের কথা বলা হলেও কনটেইনারের ভেতরের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কনটেইনার খুলতেই একের পর এক বেরিয়ে আসে বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দামি ইঞ্জিন এবং বিপুল পরিমাণ টায়ার।

উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের পরিচিত ব্র্যান্ড BMW এবং Lexus-এর অত্যন্ত মূল্যবান মডেল Lexus LX-600 ও Lexus SC-430-এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।

প্রাথমিক হিসাবে এসব গাড়ির অংশ ও যন্ত্রাংশের বাজারমূল্য প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কনটেইনারটি খুলে এসব পণ্য জব্দ করেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) কর্মকর্তারা।

তবে ঘটনাটি শুধু কোটি কোটি টাকার গাড়ির যন্ত্রাংশ উদ্ধারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

চালানটির আমদানি প্রক্রিয়া, আর্থিক লেনদেন, পেমেন্টের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক দলিলপত্র খতিয়ে দেখতে গিয়ে সম্ভাব্য মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় নেওয়া হচ্ছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জাপান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা কনটেইনারটির পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ‘ইউজড স্পেয়ার পার্টস’ বা পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ।

কিন্তু গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কনটেইনারটি পরীক্ষা করতে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখতে পান, সাধারণ পুরোনো যন্ত্রাংশের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে বিলাসবহুল গাড়ির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আলাদা আলাদা করে রাখা হয়েছে গাড়ির ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন মূল্যবান কম্পোনেন্ট। প্রাথমিকভাবে কনটেইনারে BMW, Lexus LX-600 এবং Lexus SC-430 মডেলের গাড়ির অংশ শনাক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরনের টায়ার এবং অন্যান্য গাড়ির যন্ত্রাংশ।

ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া সামগ্রীর এই বড় ধরনের অসামঞ্জস্যই কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্দেহ আরও গভীর করে তোলে।

ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকগুলোর একটি হলো-চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর প্রায় এক মাস পার হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের পক্ষ থেকে এখনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি বলে কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে।

সাধারণত আমদানিকৃত পণ্য খালাসের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের কোনো প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় চালানটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে, চালানটি নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছিল।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিষয়টি জানতে পেরে কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কনটেইনারটি পরীক্ষা করেন। এরপরই ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে থাকা পণ্যের বড় ধরনের অমিল সামনে আসে।

কনটেইনারে পাওয়া যন্ত্রাংশগুলো দিয়ে সম্পূর্ণ গাড়ি তৈরি করা সম্ভব কি না, কোন মডেলের কতটি গাড়ির অংশ রয়েছে এবং প্রতিটি অংশের প্রকৃত বাজারমূল্য কত-এসব বিষয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।

এ কারণে পুরো চালানটি বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতায় নেওয়া হয়েছে।

কাস্টমস কর্মকর্তারা প্রতিটি যন্ত্রাংশের ধরন, মডেল, উৎপাদন সাল, ব্যবহারযোগ্যতা এবং বর্তমান অবস্থা যাচাই করছেন।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করে এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

প্রাথমিক হিসাবে উদ্ধার করা গাড়ির অংশ, ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের সম্মিলিত মূল্য ৯ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই মূল্য এখনো চূড়ান্ত নয়।

কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখন শুধু উদ্ধার করা পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না।চালানটির-আমদানি মূল্য, এলসি বা পেমেন্টের ধরন, বাণিজ্যিক দলিলপত্র, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্য, এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘোষিত পণ্যের মূল্য এবং প্রকৃত পণ্যের মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেলে তা শুল্ক ফাঁকি, পণ্যের ভুল ঘোষণা কিংবা অন্য কোনো আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসবে।

এ কারণে সংশ্লিষ্টদের আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, পুরো চালানটির বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

প্রতিটি যন্ত্রাংশের প্রকৃত পরিচয়, বাজারমূল্য এবং আমদানির নথিপত্র যাচাই শেষে ঘোষিত মূল্যের সঙ্গে প্রকৃত মূল্যের পার্থক্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর প্রযোজ্য শুল্ক-কর হিসাব করা হবে।

তবে ‘ইউজড স্পেয়ার পার্টস’-এর ঘোষণা দিয়ে আনা একটি কনটেইনার থেকে বিপুল অর্থমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ির অংশ, ইঞ্জিন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট উদ্ধারের ঘটনায় ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এক মাস ধরে বিল অব এন্ট্রি না থাকা, নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চালান খালাসের প্রাথমিক তথ্য এবং ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের বড় ধরনের অমিল-সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন কাস্টমস গোয়েন্দাদের বিশেষ তদন্তের কেন্দ্রে।

তদন্ত শেষে এই রহস্যময় কনটেইনারের পেছনে শুধু শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা ছিল, নাকি এর সঙ্গে আরও বড় কোনো আর্থিক অনিয়ম বা মানিলন্ডারিংয়ের যোগসূত্র রয়েছে-সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।