চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্র মেহেদীবাগে ‘এরিস্টোকেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ চালুর প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর অনিয়ম, নকশা জালিয়াতি, পরিবেশগত ছাড়পত্রের ঘাটতি এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি প্রয়োজনীয় অনুমোদন, ছাড়পত্র ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সনদ ছাড়া নকশাবহির্ভূত একটি ভবনে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে-এমন অভিযোগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট ছয় সরকারি সংস্থাকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী নুসরাত জাহানের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের অপর আইনজীবী মোহাম্মদ রিদুয়ান সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এই আইনি নোটিশ জারি করেন।
নোটিশটি যৌথভাবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং এরিস্টোকেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে হাসপাতালটির বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে লিখিতভাবে অবহিত না করা হলে জনস্বার্থ ও কাঠামোগত নিরাপত্তা রক্ষায় হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী তথ্যের সূত্র উল্লেখ করে আইনি নোটিশে দাবি করা হয়েছে, মেহেদীবাগের যে বহুতল ভবনে ‘এরিস্টোকেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ চালুর প্রস্তুতি চলছে, সেটি মূলত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে অনুমোদিত।
হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো সিডিএ অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নোটিশে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি করা হয়েছে ভবনের কাঠামোগত নকশা ও বাস্তব নির্মাণের তফাত নিয়ে।
আইনি নোটিশ অনুযায়ী, ভবনের অনুমোদিত মূল নকশায় ২০টি মূল পিলার (স্তম্ভ) থাকার বিধান থাকলেও বাস্তবে নির্মাণ করা হয়েছে ১৭টি।
অর্থাৎ অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব কাঠামোর বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে, নকশায় মাত্র একটি লিফটের অনুমোদন থাকলেও ভবনে তিনটি লিফট স্থাপন করা হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় নয়, ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সংশ্লিষ্ট-এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নোটিশদাতা।
হাসপাতাল, কিন্তু নিরাপত্তা কোথায়?
একটি হাসপাতাল বা পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়। ফলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, পর্যাপ্ত পার্কিং, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কিন্তু আইনি নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে, ‘এরিস্টোকেয়ার’ এর ক্ষেত্রে এসব মৌলিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রস্তুতি নিয়েই গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশেষ করে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগের সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থার ঘাটতি যুক্ত হলে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে।
হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর কোনো অগ্নিকাণ্ড, ভবনের অংশবিশেষ ধসে পড়া কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে নোটিশে সতর্ক করা হয়েছে।
পরিবেশের ওপরও চাপের আশঙ্কা
মেহেদীবাগ চট্টগ্রাম নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত একটি এলাকা। সেখানে একটি বড় চিকিৎসাকেন্দ্র চালু হলে রোগী ও দর্শনার্থীদের যাতায়াত, যানবাহনের চাপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসাবর্জ্য নিষ্পত্তির মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ নিশ্চয়তা ছাড়া হাসপাতাল চালু করা হলে শুধু রোগী ও পথচারীর নিরাপত্তাই নয়, আশপাশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
প্রশাসনের কাছে চার দফা দাবি
আইনি নোটিশে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে চারটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে। প্রথমত, সরকারি সব লাইসেন্স, অনুমোদন এবং পরিবেশ ও ফায়ার সনদ যাচাই না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালের সব ধরনের উদ্বোধন ও চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অনুমোদিত ২০টি পিলারের স্থানে ১৭টি পিলার এবং একটি লিফটের জায়গায় তিনটি লিফট স্থাপনের অভিযোগসহ কথিত নকশা জালিয়াতির বিষয়টি নিরসনে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দিয়ে ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব পরীক্ষা করতে হবে।
তৃতীয়ত, সিডিএকে অবিলম্বে সরেজমিন পরিদর্শন করে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের তফাত নিরূপণ করতে হবে এবং চতুর্থত, তদন্তে নকশাবহির্ভূত নির্মাণ বা নিরাপত্তাহীনতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ভবনমালিক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘এরিস্টোকেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কতটা সত্য, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর।
বিশেষ করে ভবনের অনুমোদিত নকশা, বাস্তব কাঠামো, পিলারের সংখ্যা, লিফট স্থাপন, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং হাসপাতাল পরিচালনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন-প্রতিটি বিষয় সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, জনস্বার্থবিরোধী এই অপরিকল্পিত উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি ঘটলে তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও হাসপাতাল মালিকপক্ষকে বহন করতে হবে।
এ অবস্থায় অভিযোগগুলোকে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট ছয় সরকারি সংস্থার সমন্বিত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
অভিযোগ সত্য হলে নকশা জালিয়াতি, অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণ, পরিবেশগত বিধি লঙ্ঘন কিংবা জননিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আর অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই তা স্পষ্ট হওয়া উচিত। কারণ একটি হাসপাতালের ক্ষেত্রে অনুমোদন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সামান্য ছাড়ও মানুষের জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
