সদরঘাটে মাদকের সাম্রাজ্য চাদাঁবাজী: নেপথ্যে স্বেচ্ছাসেবক-শ্রমিক লীগের পদধারী ও পুলিশের অসৎ সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:১৮

বিশেষ প্রতিবেদক: পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকারের আমল থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পদ-পদবির দাপট দেখিয়ে চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাট থানা এলাকায় কোটি কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগ নামধারী একদল মাদক কারবারি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে, বিগত আমলের সুবিধাভোগী এই অপরাধ চক্রটি কেবল মাদক কারবার ও চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নেই, অর্জিত বিপুল অর্থ দিয়ে তারা বর্তমানে দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টসহ নানা সরকারবিরোধী চক্রান্ত ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে।

সর্বশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদরঘাট থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই শাহাদাত হোসেনকে প্রতি মাসে ১ থেকে ২ লাখ টাকা ঘুষ (মাসোহারা) দিয়ে পুরো এলাকায় উন্মুক্ত ও বেপরোয়া মাদক বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশের প্রত্যক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং তথাকথিত ‘ক্যাশিয়ার’দের মধ্যস্থতায় পশ্চিম মাদারবাড়ি, শুভপুর রেলবিট, টং ফকির মাজার এবং কর্ণফুলী নদীর নানা ঘাট এখন অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় বিতর্কিত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চিহ্নিত অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা স্থানীয় বাসিন্দারা।

পূর্ব মাদারবাড়ির মেথর পট্টি গলির মুখে ফারুকের টঙের চা দোকানের আড়ালে প্রতিদিন প্রকাশ্যে চলে ইয়াবা বিক্রি। স্থানীয়দের তথ্যানুযায়ী, এই স্পটটির মূল হোতা শ্রমিক লীগ নেতা নসু মিয়া। নসু দীর্ঘদিন ধরে থানাকে ম্যানেজ করে ইয়াবা কারবার পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে এস আই শাহাদাত হোসেনকে মাসোহারা দিয়ে সে বাণিজ্য আরও বেপরোয়া ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মাদক বিক্রির অর্থের একটি অংশ সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।

একই এলাকার বালুর মাঠ কমিশনার বাড়ি সংলগ্ন ইব্রাহিম মান্নান প্রকাশ মিনুর ভবনে ফাতেমা ও তার স্বামী ফুল মিয়া আরেকটি বড় ইয়াবা আস্তানা পরিচালনা করছে। এস আই শাহাদাত দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই দম্পতি আরও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি শুরু করেছে।

পশ্চিম মাদারবাড়ির রশিদ মাস্টার বাড়ির পাশের রেলবিট এলাকায় জসিম উদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন লেনদেন হয়। গত ২৬ মার্চ টং ফকির মাজার এলাকা থেকে ৫ হাজার ইয়াবাসহ জসিমকে এস আই হিরক সিং আটক করলেও, থানার অভ্যন্তরীণ চাপে মামলা দুর্বল করে তাকে জামিনে বের করে আনা হয়।

সংলগ্ন স্পটে ফারুকের নির্দেশে ‘পাবনা’ নামের এক সহযোগী রাতে মাদক বিক্রি সামলায়। এছাড়া শুভপুর রেলবিটের কাছে এয়াকুব ডন ও আরিফের টং দোকানে নিয়মিত বসে মাদক সেবন ও বিক্রির আসর।

সড়কে চাঁদা: শুভপুর রাহাত সেন্টার থেকে পুড়া মসজিদ এবং শুভপুর মোড় থেকে রশিদ মাস্টার বাড়ি এলাকা পর্যন্ত রাতে পার্কিং করা প্রতিটি ট্রাক থেকে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হয়। ইব্রাহিম, ‘ল্যাংড়া’ শহিদ ও সিরাজ নামের তিন লাইনম্যান জোরপূর্বক এই টাকা তুলে কনস্টেবল ইদ্রিস আলম ও জাহেদ কামালের হাতে তুলে দেন।

ঘাট-বাণিজ্য: কর্ণফুলী নদীর বাংলা বাজার, আসাম বেঙ্গল, নবী দোভাষ, আদম ও আনু মাঝির ঘাটে চলে সবচেয়ে বড় অনৈতিক লেনদেন। থানার সাবেক ‘ক্যাশিয়ার’ দাবিদার সিরাজুল ইসলাম মিন্টুর মাধ্যমে অবৈধ পণ্যবোঝাই প্রতিটি গাড়ি থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। ড্রাইভার কনস্টেবল হাসনাত ও কনস্টেবল মং এই ঘাটে নিয়মিত টহল দিয়ে অর্থ আদায়ে ভূমিকা রাখেন।

এলাকায় তিনটি বড় জুয়ার আসর সক্রিয় রয়েছে—মাঝিরঘাটে ‘জুয়াড়ি নাসির’, আদম ঘাটে ‘শিবির কালু’ এবং পশ্চিম মাদারবাড়ি কাঁচাবাজারে ঝন্টুর আসর। এসব আসরে জুয়ার পাশাপাশি ফেনসিডিল ও ইয়াবা বিক্রি হয়। এএসআই মুসতাক, কনস্টেবল হাসনাত ও কনস্টেবল মং অর্থের বিনিময়ে এসব আসর নির্বিঘ্নে চলার সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন।

সুনির্দিষ্ট এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সদরঘাট থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই শাহাদাত হোসেন তার সম্পৃক্ততা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করেন, “কোনো অপরাধ বা অপরাধীর সাথে আমার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। কেউ আমার নাম ভাঙালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।” একইভাবে অভিযুক্ত ক্যাশিয়ার মিন্টুও নিজেকে নির্দোষ দাবি করে জানান, তিনি বর্তমানে নিজস্ব ব্যক্তিগত ব্যবসায় জড়িত।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন—যেখানে সার্বক্ষণিক মোবাইল টিম ও টহল পুলিশ থাকে, তার কয়েক গজের মধ্যে কীভাবে বছরের পর বছর এসব আসর চলে?

সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে থাকা কালোবিড়ালদের চিহ্নিত না করলে সদরঘাট এলাকাকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব নয়। এসআই শাহাদাত হোসেন, এএসআই মুসতাক, কনস্টেবল ইদ্রিস, জাহেদ, হাসনাত ও মং-এর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা। ফ্যাসিস্ট আমল থেকে মাদক কারবারে যুক্ত শ্রমিক লীগ নেতা নসু, জসিম, ফুল মিয়া-ফাতেমা দম্পতিসহ মূল সিন্ডিকেটের অবৈধ সম্পদের উৎস ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের বিষয়টি তদন্ত করা।চুনোপুঁটি বা ভাসমান মাদকসেবীদের আটক না করে মূল হোতা ও কথিত ‘ক্যাশিয়ার’দের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা।

মাদক কারবারীরা সাথে প্রতিবেদকে নিউজ না করে তাদের সাথে যোগাযোগ করার অনরোধ জানান।