রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল হিসাব বিভাগে ঘুষ বাণিজ্য ও জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র!

বৃদ্ধ ও বিধবাদের পেনশনের টাকা পেতেও ‘ঘুষের রেট’

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:৩৭

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের পেনশন-সংক্রান্ত অর্থ পরিশোধে অনিয়ম, হয়রানি ও ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পূর্বাঞ্চলের ফাইন্যান্স অ্যাডভাইজার অ্যান্ড চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার (এফএঅ্যান্ডসিও) সাইদুর রহমান এবং তাঁর দপ্তরের হিসাবরক্ষক শেখ জামালসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

অভিযোগকারীদের দাবি, পে-ফিক্সেশন থেকে শুরু করে বকেয়া পেনশন ও পারিবারিক পেনশনের অর্থ ছাড় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ফাইল আটকে রাখা, অযৌক্তিক বিলম্ব এবং অর্থ দাবির ঘটনা ঘটছে।

এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগ অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী কিংবা কোনো কর্মচারীর মৃত্যুর পর তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারী ও নির্ধারিত সুবিধাভোগীরা কল্যাণ তহবিল, বকেয়া পেনশন এবং অন্যান্য প্রাপ্য অর্থ তুলতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ছেন।

তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাইল নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আবার ঘুষ দিলে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রলোভন বা অর্থ দাবির অভিযোগও রয়েছে।

রেলওয়ের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগে পারিবারিক পেনশন-সংক্রান্ত অর্থ পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

তাঁর অভিযোগ, এফএঅ্যান্ডসিও সাইদুর রহমান ও হিসাবরক্ষক শেখ জামালসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব এবং অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে।

ওই কর্মচারীর ভাষ্য, তাদের অত্যাচারে আমরা অসহায়-তাদের বিচার চাই।

অভিযোগকারীদের দাবি, পারিবারিক পেনশন সহজীকরণের নামে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তদন্ত, পরিচয় যাচাই ও নথিপত্র পর্যালোচনার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।

অভিযোগ, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হলেও অর্থের বিনিময়ে কোনো কোনো ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়।

সূত্র বলছে, একজন রেলকর্মীর মৃত্যুর পর তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারী বা নির্ধারিত সুবিধাভোগীর পারিবারিক পেনশন ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে পরিচয়, উত্তরাধিকার, চাকরির নথি, প্রাপ্যতার হিসাব এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন।

কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, পূর্ব রেলের হিসাব বিভাগের কিছু ক্ষেত্রে এই যাচাইপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।

তাঁদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় তদন্ত ও নথি যাচাই ছাড়াই কোনো কোনো দাবির বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এমনকি ভুয়া পরিচয়, অযোগ্য সুবিধাভোগী কিংবা অননুমোদিত দাবির মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন তাঁরা।

অভিযোগকারীরা মনে করেন, এফএঅ্যান্ডসিও দপ্তরের পেনশন-সংক্রান্ত কার্যক্রমের নিরপেক্ষ আর্থিক ও প্রশাসনিক নিরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।

রেলওয়ে সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগের কিছু কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে পেনশন দপ্তরটি সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) থেকে আকস্মিকভাবে টিএ পলোগ্রাউন্ডে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

এতে বয়োবৃদ্ধ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী পেনশনারদের ডেটা এন্ট্রি এবং আইবাস++ (iBAS++)-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ভোগান্তি বেড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ, আলোচনা ও সমালোচনা হলে দপ্তরটি আবার সিআরবিতে স্থানান্তর করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পেনশন দপ্তরের অবস্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত, এর প্রশাসনিক যৌক্তিকতা এবং প্রবীণ পেনশনারদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আনুষ্ঠানিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

কারণ, পেনশন-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে যাঁদের শারীরিক সক্ষমতা সীমিত, তাঁদের জন্য দপ্তরে যাতায়াত ও প্রযুক্তিগত জটিলতা বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করতে পারে।

ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) চালুর পর অনেক প্রবীণ ও পারিবারিক পেনশনারের মোবাইল নম্বর কিংবা ব্যাংক হিসাবের তথ্যসংক্রান্ত জটিলতার কারণে অর্থ পরিশোধে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, মাঠপর্যায়ের হিসাব বিভাগ ও পেনশন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ফাইল পাঠানোর প্রবণতায় সমস্যার সমাধান দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

এতে প্রাপ্য অর্থ তুলতে গিয়ে পেনশনারদের বারবার দপ্তরে যেতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ধরনের জটিলতা কাজে লাগিয়ে ঘুষ দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের পরিধি শুধু পারিবারিক পেনশন বা বকেয়া অর্থ ছাড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পে-ফিক্সেশন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা।

পে-ফিক্সেশন বেতন নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতিজনিত আর্থিক সুবিধা এবং অবসরকালীন প্রাপ্যতার হিসাব জড়িত থাকতে পারে।

এ প্রক্রিয়ায় ভুল হিসাব, অনিয়ম কিংবা অযৌক্তিক বিলম্ব হলে কর্মচারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা তাঁদের মানসিক চাপও বাড়ায়।

ভুক্তভোগীদের দাবি, পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগের বিভিন্ন অর্থবছরের বকেয়া পেনশন বিল, পে-ফিক্সেশন এবং অর্থ ছাড়ের নথি পুনর্নিরীক্ষা করা হোক।

এতে হিসাবের ভুল, অযৌক্তিক বিলম্ব, বিধিবহির্ভূত অনুমোদন কিংবা সরকারি অর্থের অপব্যবহার হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করা সহজ হবে।

অভিযোগগুলোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এসব জটিলতার প্রভাব পড়ছে রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণির অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, মৃত কর্মচারীদের বিধবা স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধী সন্তানদের ওপর। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে পেনশনই নিয়মিত জীবনযাপন, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

প্রাপ্য অর্থ পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হলে এসব পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল কোনো পরিবারকে বারবার দপ্তরে যাতায়াত করতে হলে সময় ও অর্থ-দুই দিক থেকেই বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, পূর্ব রেলের হিসাব বিভাগের পেনশন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার দিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন অর্থবছরের বকেয়া পেনশন ও পে-ফিক্সেশন বিল, পারিবারিক পেনশন অনুমোদনের নথি, সুবিধাভোগীদের পরিচয় ও উত্তরাধিকার যাচাই, তদন্ত প্রতিবেদন, অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর, ব্যাংক লেনদেন এবং নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ।

একই সঙ্গে কোন ফাইল কত দিন ধরে অনিষ্পন্ন রয়েছে, বিলম্বের কারণ কী, অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো অর্থ দাবি করা হয়েছিল কি না এবং কোনো ক্ষেত্রে বিধিবহির্ভূত অর্থ পরিশোধ হয়েছে কি না-এসব বিষয় যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগের এফএঅ্যান্ডসিও সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন ধরেননি।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম পিইঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।